দীর্ঘদিনের ঋণের বোঝা ও খেলাপি হওয়ার কারণে নতুন করে ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে যেসব প্রান্তিক কৃষক সংকটে ছিলেন, তাঁদের জন্য আর্থিক স্বস্তি নিয়ে এসেছে সরকারের কৃষিঋণ মওকুফ কর্মসূচি। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের আসল ও সুদ মওকুফের আওতায় সারাদেশের ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষক সুবিধা পেয়েছেন। তাঁদের ঋণ নিষ্পত্তির বিপরীতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে সরকার পরিশোধ করেছে ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে গত ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি জানান, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত এ কর্মসূচির আওতায় দেশের সব উপজেলার কৃষক সুবিধা পেয়েছেন। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া কৃষকদের ক্ষেত্রে মূল ঋণের পাশাপাশি জমা হওয়া সুদও মওকুফ করা হয়েছে।
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে নেওয়া এ উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ঋণসংক্রান্ত চাপ কমানো এবং ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে ছিটকে পড়া কৃষকদের পুনরায় ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ তৈরি করা। ঋণ নিষ্পত্তির অর্থ সরাসরি ব্যাংকগুলোকে পরিশোধ করায় কৃষকদের আলাদা করে অর্থ জমা দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সুবিধা
ঋণ মওকুফ কর্মসূচির সবচেয়ে বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে। ব্যাংকটি ৭ লাখ ৯ হাজার ৬৭৯ জন কৃষকের ৬০৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা ঋণ মওকুফ করেছে। বাকি ৭ লাখ ২৪ হাজার ৮০৩ জন কৃষক রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে সুবিধা পেয়েছেন। তাঁদের জন্য পরিশোধ করা হয়েছে প্রায় ৭৪৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
কর্মসূচির আওতায় ঋণের আসল ও সুদ—দুই অংশই নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ফলে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার কারণে যেসব কৃষক নতুন ঋণ নিতে পারছিলেন না, তাঁদের ব্যাংকিং কার্যক্রমে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে ঋণ মওকুফের পর নতুন ঋণ পাওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রচলিত ঋণনীতি ও যোগ্যতার শর্তের ওপর নির্ভর করবে।
কৃষকের অভিজ্ঞতায় ঋণমুক্তির স্বস্তি
যশোর সদর উপজেলার কয়েকজন কৃষকের অভিজ্ঞতায় এ কর্মসূচির বাস্তব প্রভাব উঠে এসেছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া বক্তব্যে তাঁরা জানান, ঋণ পরিশোধ করতে না পারার কারণে দীর্ঘদিন ধরে যে দুশ্চিন্তায় ছিলেন, মওকুফের সিদ্ধান্তে তা অনেকটাই কমেছে।
উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়নের নারাঙ্গলী গ্রামের কৃষক ফারুক হোসেন জানান, ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়ার পর তা পরিশোধের জন্য বাড়ির গাছ কিংবা গোয়ালের গরু বিক্রির কথা ভাবছিলেন তিনি। ঋণ মওকুফ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাঁকে এসব সম্পদ বিক্রি করতে হয়নি। তাঁর ভাষায়, ‘আমার মতো মানুষের ওপর থেকে বড় একটা বোঝা নেমে গেছে। বিপদের সম্বল বাড়ির গাছ, গরু কিছুই বিক্রি করতে হয়নি।’
একই উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ঝাউদিয়া গ্রামের কৃষক মো. মহিউদ্দিন বলেন, ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য না থাকায় তিনি চাপে ছিলেন। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার ঋণ মওকুফ করায় তিনি স্বস্তি পেয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘আমার বিক্রি করার মতো কিছুই নেই। কোনোভাবেই এই ঋণ শোধ করতে পারতাম না। সরকার আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।’
অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণ মওকুফের পাশাপাশি প্রয়োজন উৎপাদন ব্যয় কমানো
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বাসসকে বলেন, সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক স্বস্তি। এ উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর মতে, কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লে দেশের সামগ্রিক উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তাও শক্তিশালী হবে।
তবে শুধু ঋণ মওকুফ করলেই কৃষকদের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করেন তিনি। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো, সময়মতো সার-বীজসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সরবরাহ এবং লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন এ অর্থনীতিবিদ।
তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হলে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য সরবরাহে সংকট দেখা দিলে আমদানিকারক দেশগুলোকে বেশি দাম গুনতে হয়। এ কারণে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় কৃষি উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে যেসব কৃষকের ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার, ৩০ হাজার বা ৫০ হাজার টাকা কিংবা তার বেশি, তাঁদের সমস্যার সমাধানে আলাদা সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
কৃষিতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের
দেশের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান বিবেচনায় ব্যাংকঋণ বাড়ানোর বিষয়টিও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান ছিল ১১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। তবে কৃষি ও পল্লী খাতে ঋণ বিতরণের জন্য ব্যাংকগুলোর আগের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল নিট ঋণ ও অগ্রিমের ২ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
এ পরিস্থিতিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগের অর্থবছরের ৩৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এটি ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর নিট ঋণ ও অগ্রিমের অন্তত ৪ শতাংশ কৃষি খাতে বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো কৃষি ও পল্লী খাতে মোট ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। নির্ধারিত ৩৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এ পরিমাণ বেশি। আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে এ খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৫ হাজার ৫০৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বা ১৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
নতুন নীতিমালায় কৃষিঋণ বিতরণ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রকৃত কৃষক শনাক্তে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের তথ্য এবং সরকারি কৃষক কার্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে। নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করতে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও দলীয় গ্যারান্টির মতো বিকল্প জামানত বিবেচনার কথাও বলা হয়েছে।
ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়লেও বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ
কৃষিঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলেও নির্ধারিত অর্থ কৃষকের কাছে সময়মতো পৌঁছানো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস, অর্থাৎ জুলাই-আগস্টে ব্যাংকগুলো ৬ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ করেছে। এটি পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার ছিল ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
২৪ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যভিত্তিক এক প্রতিবেদনে এ চিত্র তুলে ধরে ঢাকা ট্রিবিউন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আগস্ট শেষে কৃষি খাতে মোট ঋণের স্থিতি ছিল ৭০ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৯ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। তবে খেলাপি ঋণের এ বৃদ্ধির পেছনে ২০২৪ সালের নভেম্বরে জারি করা ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনসংক্রান্ত নতুন নির্দেশনার প্রভাব রয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় ঋণ মওকুফের পাশাপাশি কৃষকের কাছে নতুন ঋণ পৌঁছানো, ঋণের অর্থ উৎপাদনমুখী কাজে ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষি বিমা ও অন্যান্য সহায়তা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের আসল ও সুদ মওকুফের জন্য ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি বিমা চালুর পরিকল্পনার কথাও বাজেট বক্তৃতায় জানানো হয়।
সব মিলিয়ে ১৪ লাখের বেশি কৃষকের ঋণ মওকুফ তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ কমানোর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে তাঁদের পুনঃঅন্তর্ভুক্তির সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এ উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি সুফল নির্ভর করবে কৃষকদের নতুন ঋণপ্রাপ্তি, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য এবং কৃষি খাতে ধারাবাহিক অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর।

