বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

চীনের গোপন মহাকাশযানের ছবি প্রকাশ করল যুক্তরাষ্ট্র

‘শেনলং’-এর সঙ্গে মার্কিন এক্স-৩৭বি মহাকাশযানের মিল; মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ে উদ্বেগ ডিআইএর প্রতিবেদনে

পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা চীনের গোপন মনুষ্যবিহীন মহাকাশযান ‘শেনলং’-এর একটি ছবি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের মহাকাশ হুমকিবিষয়ক নতুন এক প্রতিবেদনে ছবিটি প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট।

ছবিতে ডানাযুক্ত একটি মহাকাশযান দেখা গেছে, যার সঙ্গে মার্কিন স্পেস ফোর্সের গোপন ‘এক্স-৩৭বি’ মহাকাশযানের বেশ মিল রয়েছে। মার্কিন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ভ্যান্টর—যার আগের নাম ম্যাক্সার—২০২৪ সালে ছবিটি ধারণ করেছিল।

ছবিতে মহাকাশযানটির কার্গো বে বা পেলোড বে-এর দরজাও দেখা যায়। এগুলো থেকে ধারণা করা হচ্ছে, যানটি ভেতরে ছোট স্যাটেলাইট বা অন্য মহাকাশযান বহন ও কক্ষপথে মোতায়েন করতে সক্ষম হতে পারে। তবে শেনলংয়ে মহাকাশ অস্ত্র বহন করা হচ্ছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

চারটি কক্ষপথ মিশন পরিচালনা করেছে শেনলং

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে শেনলং চারটি পরিচিত কক্ষপথ মিশন পরিচালনা করেছে। এর সর্বশেষ মিশনটি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে উৎক্ষেপণ করা হয়। এসব মিশন প্রায় নয় মাস ধরে চলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ) তাদের প্রতিবেদনে ২০২২ সালের নভেম্বরে শেনলংয়ের একটি সহচর স্যাটেলাইটের সঙ্গে কৌশলগতভাবে চলাচলের ঘটনা তুলে ধরেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মহাকাশযানটিকে স্যাটেলাইটটির প্রায় এক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে অবস্থান ধরে রাখতে দেখা যায়। একপর্যায়ে বস্তু দুটি পরস্পরের ১০০ মিটারের মধ্যে চলে আসে। পরে স্যাটেলাইটটিকে পুনরায় ছেড়ে দেওয়ার আগে মহাকাশযানটির সঙ্গে সেটির যোগাযোগ হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মহাকাশ অস্ত্র তৈরিতে চীনের অগ্রগতির দাবি

ডিআইএর প্রতিবেদনে চীনের মহাকাশ অস্ত্র তৈরির অগ্রগতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্দেশিত শক্তির অস্ত্র বা ‘ডিরেক্টেড-এনার্জি ওয়েপন’ (ডিইডব্লিউ)। এ ধরনের অস্ত্রে লেজার বা ঘনীভূত কণার রশ্মি ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তুকে অকার্যকর করে দেওয়ার সক্ষমতা থাকতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্ষপথে থাকা প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইট অকার্যকর, ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে চীন মহাকাশ অস্ত্র তৈরি করেছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে পারে।

ডিআইএর মূল্যায়ন অনুযায়ী, মহাকাশ গবেষণায় নেতৃত্ব নেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন নিজেদের অনুকূলে রাখার চেষ্টা করছে বেইজিং। একই সঙ্গে অন্য দেশগুলোর মহাকাশ প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যও থাকতে পারে।

রাশিয়ার পরমাণু অস্ত্রবাহী স্যাটেলাইট তৈরির আশঙ্কা

ডিআইএর প্রতিবেদনে রাশিয়ার মহাকাশ কর্মসূচি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রাশিয়া পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম স্যাটেলাইট তৈরির কাজ করছে।

প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, মহাকাশভিত্তিক এ ধরনের সক্ষমতা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ ও কোম্পানির পরিচালিত হাজার হাজার স্যাটেলাইটের দ্রুত ও আকস্মিক ক্ষতি করতে পারে। এতে স্যাটেলাইটনির্ভর যোগাযোগ, নেভিগেশন, গবেষণা, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও জাতীয় নিরাপত্তাসেবা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ডিআইএর গবেষকদের মতে, মহাকাশে তুলনামূলক কম উচ্চতায় পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণ ঘটলে বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা বা পাওয়ার গ্রিডও বিপর্যস্ত হতে পারে।

মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র স্থাপন নিষিদ্ধের চুক্তি

১৯৬৭ সালের ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ অনুযায়ী, পৃথিবীর কক্ষপথে পারমাণবিক অস্ত্র স্থাপন নিষিদ্ধ। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল।

তবে বর্তমানে মহাকাশে সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিকভাবে সর্বসম্মত কোনো ব্যবস্থা নেই। চীন ও রাশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ঠেকাতে নির্দিষ্ট নিয়ম চালুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

ডিআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন ও রাশিয়া এ ধরনের চুক্তির প্রস্তাব দিলেও মহাকাশে অস্ত্র তৈরি ও মোতায়েনের চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন