বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে সহযোগিতা বাড়াতে চুক্তির খসড়া পর্যালোচনা, ১৩টি ওয়ার্কিং গ্রুপের অংশগ্রহণ
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম দফার আনুষ্ঠানিক আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে শেষ হয়েছে। পরবর্তী দফার আলোচনা আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠানের প্রাথমিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দুই দেশ।
২৭ অক্টোবর শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী আলোচনা বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে শেষ হয়। এতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদল পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ডিজিটাল বাণিজ্য, মেধাস্বত্ব এবং বাণিজ্য সহজীকরণসহ পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে।
১৩টি ওয়ার্কিং গ্রুপে চুক্তির খসড়া পর্যালোচনা
আলোচনায় ১৩টি ওয়ার্কিং গ্রুপ প্রস্তাবিত এফটিএর বিভিন্ন অধ্যায়ের খসড়া ও কাঠামোগত বিষয় পর্যালোচনা করে। আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে ছিল পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, উৎপত্তিবিধি (Rules of Origin), শুল্ক ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণ, ডিজিটাল বাণিজ্য, স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থা (SPS), বাণিজ্যে কারিগরি বাধা (TBT) এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (এসএমই) স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়।
এসব ক্ষেত্রে দুই দেশের অবস্থান, সম্ভাবনা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি চুক্তির বিভিন্ন অধ্যায়ের কাঠামো ও খসড়া নিয়ে মতবিনিময় করেন উভয় দেশের প্রতিনিধিরা।
প্রযুক্তি স্থানান্তর ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা
সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের প্রধান আলোচক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীন বলেন, প্রস্তাবিত এফটিএ বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বিদ্যমান সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন অর্থনৈতিক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।
মালয়েশিয়ার ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর ও ডিজিটাল প্রযুক্তি খাতের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, চুক্তিটি কার্যকর হলে দেশটি থেকে প্রযুক্তি স্থানান্তর, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্প খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।
অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার প্রধান আলোচক ড. রাশিদী সাঈদ ও তাঁর প্রতিনিধিদলকে ধন্যবাদ জানানো হয়। উভয় পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থ ও সুবিধার ভারসাম্য বজায় রেখে একটি কার্যকর ও লাভজনক চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে।
জানুয়ারির বৈঠকে মতপার্থক্য নিরসনে গুরুত্ব
আলোচনার পরবর্তী ধাপে চুক্তির বিভিন্ন অধ্যায়ে বিদ্যমান মতপার্থক্য নিরসন এবং উভয় দেশের কাছে গ্রহণযোগ্য অবস্থানে পৌঁছানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ জন্য আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় দফার বৈঠক অনুষ্ঠানের প্রাথমিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে আলোচনা শেষ হওয়া মানেই চুক্তি চূড়ান্ত হওয়া নয়। চুক্তির শর্তাবলি, শুল্কছাড়ের পরিধি এবং বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন হবে।
এলডিসি উত্তরণের পর বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য নতুন বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আসিয়ানের সদস্য মালয়েশিয়ার সঙ্গে কার্যকর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হলে বাংলাদেশের পণ্য ও সেবা খাতের বাজার প্রবেশাধিকার বাড়ানো, শিল্পের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এসব সম্ভাবনার বাস্তব সুফল নির্ভর করবে চুক্তির চূড়ান্ত শর্তাবলি, শুল্কছাড়ের পরিধি, দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং বাস্তবায়ন কাঠামোর ওপর। তাই দুই দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রেখে টেকসই ও পারস্পরিক লাভজনক চুক্তি প্রণয়নকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রথম দফার আলোচনা শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি প্রণয়নের প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়েছে। জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় পরবর্তী বৈঠকে চুক্তির রূপরেখা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে আরও অগ্রগতি হবে বলে প্রত্যাশা করছে উভয় পক্ষ।

