বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

আমদানি শুল্ক কমলেও বাজারে দাম কমেছে কি না, মূল্যায়ন করবে ট্যারিফ কমিশন

১৮ ধরনের পণ্যে আমদানি শুল্ক ও কর কমানোর প্রভাব মূল্যায়নে ট্যারিফ কমিশনকে চিঠি; ওষুধ ও ডায়ালাইসিস সরঞ্জামের দাম কমা নিয়ে প্রশ্ন

আমদানি করা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ওষুধ, ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক ও কর কমানোর সুবিধা ভোক্তারা পাচ্ছেন, নাকি মূলত ব্যবসায়ীরাই লাভবান হচ্ছেন—তা যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ১৮ ধরনের পণ্যে শুল্ক ও কর ছাড়ের ফলে বাজারে দাম কতটা কমেছে, তা মূল্যায়ন করতে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনকে (বিটিটিসি) চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি।

গত ১৮ অক্টোবর পাঠানো চিঠিতে শুল্ক ও কর কমানোর প্রভাব এবং ভোক্তারা এর মাধ্যমে কতটা সুবিধা পেয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়েছে। বিটিটিসির চেয়ারম্যান নাসির-উদ-দৌলা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, তাঁরা এনবিআরের চিঠি পেয়েছেন এবং যত দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দেবেন।

এনবিআরের কাস্টমস বিভাগের পাশাপাশি ভ্যাট বিভাগ থেকেও এ বিষয়ে পৃথক বিশ্লেষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

শুল্ক ছাড়ের সুবিধা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানো নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশে প্রতিবেশী ও সমপর্যায়ের দেশগুলোর তুলনায় আমদানি শুল্ক বেশি বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন ভোক্তারা। তাঁদের অভিযোগ, সরকার বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক ও কর কমালেও অনেক সময় সেই সুবিধা ক্রেতাদের কাছে পৌঁছায় না। বরং ব্যবসায়ীরা নিজেরাই এর সুফল ভোগ করেন।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চেয়ারম্যান এ এইচ এম সফিকুজ্জামান টিবিএসকে বলেন, দেশে এমনিতেই অন্যান্য দেশের তুলনায় শুল্কহার বেশি। মাঝেমধ্যে কিছু পণ্যে শুল্ক কমানো হলেও ভোক্তা পর্যায়ে এর সুফল তেমন একটা পৌঁছায় না।

তিনি এ জন্য অসাধু ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সময়মতো শুল্ক না কমানো এবং এনবিআরের যথাযথ নজরদারির অভাবকে দায়ী করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, শুল্ক ও কর ছাড় মূলত ভোক্তাদের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই দেওয়া হয়। কিন্তু এসব সুবিধা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেওয়ার জন্য রাজস্ব ছাড় দেয় না। কয়েকটি পণ্যের তালিকা তৈরি করে ছাড়ের সুফল কারা কতটা পেয়েছেন, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এ মূল্যায়নের ফল ভবিষ্যতে শুল্ক ও করসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।

যেসব ১৮ ধরনের পণ্যে প্রভাব মূল্যায়ন করা হবে

এনবিআরের মূল্যায়নের তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় ও শিল্পপণ্য। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • কম্পোজিট পেপার ও কীটনাশক
  • খেজুর ও বিভিন্ন ধরনের মসলা
  • ডায়ালাইসিস যন্ত্রাংশ
  • বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল
  • কম্পিউটার ও এর যন্ত্রাংশ
  • পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) মেশিন
  • বৈদ্যুতিক চার্জার ও চার্জিং স্টেশন
  • বৈদ্যুতিক যানবাহন
  • কাপড়সহ অন্যান্য পণ্য

এসব পণ্যে শুল্ক ও কর ছাড়ের ফলে আমদানি ব্যয় কতটা কমেছে এবং তার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়েছে কি না, তা পর্যালোচনার আওতায় আসবে।

শুল্ক কমলেই পণ্যের দাম কমে না: ট্যারিফ কমিশন

শুল্ক সুবিধার সুফল ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানো নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও ট্যারিফ কমিশনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনে করেন, শুধু শুল্ক কমানোর ভিত্তিতে বাজারদর কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি টিবিএসকে বলেন, শুল্ক কমানোর একই সময়ে ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যেতে পারে। আবার দেশের ভেতরে পরিবহন বা সরবরাহ ব্যয়ও বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শুল্ক কমানোর পরও পণ্যের দাম না কমতে পারে।

ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, শুল্ক কমানো না হলে কোনো কোনো পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারত। তাই ছাড়ের প্রকৃত প্রভাব বুঝতে অন্যান্য ব্যয় ও বাজার পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ট্যারিফ কমিশনের মূল্যায়নের সুযোগ সীমিত। যেমন, ওষুধ ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের শুল্ক ছাড়সংক্রান্ত প্রস্তাব কমিশন থেকে দেওয়া হয়নি।

ডায়ালাইসিস সরঞ্জামে কর ছাড়ের সুফল নিয়ে প্রশ্ন

সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিচালক ডা. মহিব উল্লাহ খন্দকার টিবিএসকে বলেন, ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে আগে ৫ থেকে ৭ শতাংশ কর দিতে হলেও আমদানিকারকেরা পরে তা রেয়াত হিসেবে ফেরত পেতেন। ফলে এ কর ছাড়ের কারণে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বা রোগীরা উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাচ্ছেন না।

তিনি জানান, বাজেটে কর ছাড় দেওয়ার পরও রোগীদের ডায়ালাইসিসের খরচে এখন পর্যন্ত কোনো প্রভাব পড়েনি।

তবে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ডায়ালাইজার কেনার সময় আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে রোগীরা সরাসরি উপকৃত হতে পারেন বলে মনে করেন তিনি।

ডা. মহিব উল্লাহ বলেন, বর্তমানে একটি ডায়ালাইজারের দাম প্রায় ৮০০ টাকা। ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে দাম প্রায় ১০০ টাকা কমতে পারে। পাশাপাশি ডায়ালাইজারের ওপর কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো গেলে রোগীদের চিকিৎসাব্যয় আরও কমবে।

ওষুধের কাঁচামালে ছাড়ের প্রভাব নির্ভর করছে উৎপাদন ব্যয়ের ওপর

বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির (বিএপিআই) মহাসচিব ও হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান টিবিএসকে বলেন, ওষুধশিল্পের নতুন ১৭টি কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো উপকৃত হতে পারে।

তবে এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে কোন কাঁচামাল আগে সুবিধার বাইরে ছিল, নতুন সিদ্ধান্তে কতটা শুল্ক কমেছে এবং উৎপাদন ব্যয়ে তার কী প্রভাব পড়েছে, তার ওপর।

অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) উৎপাদনে ব্যবহৃত ৫৩টি নতুন কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও কর ছাড়ের বিষয়ে তিনি বলেন, এপিআই খাতে আগে থেকেই শুল্ক সুবিধা ছিল। ফলে নতুন সিদ্ধান্তে ভোক্তাদের জন্য সরাসরি অতিরিক্ত সুবিধা তৈরি না-ও হতে পারে।

ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধের ক্ষেত্রেও আগে থেকে শুল্ক সুবিধা থাকায় নতুন সিদ্ধান্তে ভোক্তা পর্যায়ে অতিরিক্ত মূল্যহ্রাস না-ও হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে আগে শুল্ক আরোপিত ছিল, এমন কোনো ওষুধের ক্ষেত্রে নতুন করে শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে দাম কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ওষুধশিল্পে ব্যবহৃত বায়োলজিক্যাল সেফটি ক্যাবিনেট আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করায় এনবিআরকে ধন্যবাদ জানান মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান। তবে এ সিদ্ধান্তের ফলে ভোক্তা পর্যায়ে ওষুধের দাম কমবে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি।

ভবিষ্যৎ শুল্কনীতিতে প্রভাব মূল্যায়নের গুরুত্ব

শুল্ক ও কর ছাড়ের ফলে আমদানি ব্যয় কমলেও তার সুফল ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে বাজারদর, বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা ও ব্যবসায়ীদের মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এনবিআরের উদ্যোগে ১৮ ধরনের পণ্যের মূল্যায়ন সম্পন্ন হলে শুল্ক ছাড়ের প্রকৃত প্রভাব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। এর ভিত্তিতে ভবিষ্যতে রাজস্ব ছাড়ের নীতি নির্ধারণ এবং ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় নজরদারি জোরদারের সুযোগ তৈরি হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন