তাপঝুঁকি মোকাবিলায় পৃথক মানদণ্ড ও শীতলীকরণব্যবস্থায় বিনিয়োগের সুপারিশ
অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের বছরে প্রায় সাত মাস তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতায়। গবেষণা অনুযায়ী, অতিরিক্ত গরমের কারণে অংশগ্রহণকারী কারখানাগুলোতে কর্মঘণ্টায় গড়ে ৪ দশমিক ১ শতাংশ উৎপাদনশীলতা কমেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কর্মক্ষেত্রে তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিরূপণ ও নিয়ন্ত্রণে পৃথক মানদণ্ড প্রণয়ন, আইনি স্বীকৃতি এবং কার্যকর বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ, শিল্প খাতের প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর প্রতিনিধিরা।
তারা শ্রমিকদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত নীতিমালা সংশোধন, ছোট কারখানার জন্য সহজ শর্তে পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো এবং কারখানায় শীতলীকরণব্যবস্থা স্থাপনে বিনিয়োগের জন্য সরবরাহকারীদের সহায়তা দিতে সরকার, কারখানার মালিক ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
গবেষণায় উঠে এসেছে তাপঝুঁকির চিত্র
রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে গতকাল ‘সিক্স সিজনস, ফোর সামারস’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইএলআর গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট (সিইডি), বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটি (বিসিডব্লিউএস) এবং ওয়াইজেন ইঞ্জিনিয়ারিং।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের এপ্রিলের শুরু থেকে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত—বছরে প্রায় সাত মাস—তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হয়।
ঢাকা অঞ্চলের আটটি পোশাক কারখানার বিভিন্ন উৎপাদন বিভাগে ২৮টি তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা পরিমাপক সেন্সর স্থাপন করে প্রতি ঘণ্টায় পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা। পাশাপাশি প্রায় ৩৬ জন শ্রমিকের বাসার পরিবেশও পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ফলাফলে দেখা গেছে, সারা বছরই কারখানার ভেতরে তাপজনিত চাপ বাইরের পরিবেশের তুলনায় বেশি থাকে। বিশেষ করে পোশাক ইস্ত্রি ও ফিনিশিং বিভাগে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। এসব বিভাগের শ্রমিকেরা কর্মদিবসের ৫৮ শতাংশ সময় উচ্চ তাপজনিত ঝুঁকিতে এবং প্রায় ১৮ শতাংশ সময় মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে কাটিয়েছেন।
বাসাবাড়িতেও কমছে না গরমের তীব্রতা
তাপমাত্রার প্রভাব শুধু কারখানার কর্মপরিবেশে সীমাবদ্ধ নয়; শ্রমিকদের বাসাবাড়িতেও এর প্রভাব দেখা গেছে। জুন মাসের একটি সপ্তাহের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, রাতেও শ্রমিকদের বাসার তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে ছিল।
কিছু বাসায় সন্ধ্যার পর তাপমাত্রা কারখানার উৎপাদনকক্ষের চেয়েও বেশি ছিল। এমনকি সারা রাতেও তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। ফলে কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় গরমের মধ্যে কাজ করার পরও শ্রমিকেরা বাসায় গিয়ে স্বস্তি পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না।
বিসিডব্লিউএসের নির্বাহী পরিচালক ও শ্রমিকনেত্রী কল্পনা আক্তার বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শ্রমিকদের বক্তব্য প্রায়ই গুরুত্ব পায় না। কারখানা ও বাসা—দুই জায়গাতেই অতিরিক্ত গরমের কারণে শ্রমিকেরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। কখনো কখনো অসুস্থতার কারণে তাঁদের ছুটিও নিতে হচ্ছে।
তাপঝুঁকি মোকাবিলায় নীতিমালার দাবি
কর্মক্ষেত্রে তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার মানদণ্ড বা নীতিমালায় অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা থেকে শ্রমিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় নিয়ম ও নির্দেশনা নির্ধারণ করা হয়। এর আওতায় তাপমাত্রা পরিমাপের পদ্ধতি, কোন পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের অতিরিক্ত বিরতি দিতে হবে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে কারখানার মালিকদের কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে, তা নির্দিষ্ট করা যেতে পারে।
অনুষ্ঠানে লায়লা গ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক মো. শামীম ফেরদৌস বলেন, কারখানার উৎপাদনকক্ষে সর্বোচ্চ কত তাপমাত্রা গ্রহণযোগ্য হবে, সরকার তা নির্ধারণ করে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে।
কারখানায় শীতলীকরণব্যবস্থা স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। এ ব্যয়ের দায়িত্ব কে নেবে, সে প্রশ্নও তোলেন শামীম ফেরদৌস।
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইএলআর গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক জেসন জুড বলেন, ভিয়েতনামের মতো দেশে শিল্পকারখানায় তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় নির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে।
শীতলীকরণব্যবস্থায় বিনিয়োগের সুপারিশ
গবেষণায় কারখানার অবস্থান, উৎপাদনপ্রক্রিয়া ও ভবনের নকশা বিবেচনায় নিয়ে তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি পরিমাপের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি যোগ্য প্রকৌশলীদের সহায়তায় কারখানায় শীতলীকরণব্যবস্থা স্থাপনের ব্যয় ও সম্ভাব্য আর্থিক সুফল মূল্যায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের বিনিয়োগের খরচ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও ক্রেতারা কীভাবে ভাগ করে নেবে, সে বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ছোট কারখানাগুলোর জন্য সহজ শর্তে পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো এবং শীতলীকরণব্যবস্থা স্থাপনে সরবরাহকারীদের সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রকৌশলগত মূল্যায়নে দেখা গেছে, কারখানায় শীতলীকরণব্যবস্থা স্থাপনে বিনিয়োগের অর্থ তুলনামূলক দ্রুত উঠে আসতে পারে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, গড়ে এক বছরেরও কম সময়ে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত আসতে পারে। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এ সময় বেড়ে ২ দশমিক ৯ বছর এবং সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে ৪ দশমিক ৪ বছর হতে পারে।
গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, দেশের রপ্তানিমুখী পোশাক খাতে তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে শীতলীকরণব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগে আনুমানিক ২৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। তিন বছরে এ অর্থ ব্যয় করা হলে তা ২০২৫ সালে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয়ের প্রায় শূন্য দশমিক ২ শতাংশের সমান হবে।
শ্রমিকদের নিরাপত্তানীতিতে পরিবর্তনের প্রস্তাব
তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে শ্রমিকদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত নীতিমালা সংশোধনের সুপারিশও করেছে গবেষণাটি। প্রস্তাবিত সংশোধনে কর্মঘণ্টা, কাজ ও বিশ্রামের ভারসাম্য, উৎপাদনের পরিমাণভিত্তিক মজুরি, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা এবং চিকিৎসাজনিত ছুটির বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের মতে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধু প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা স্থাপন যথেষ্ট নয়; শ্রমিকদের কাজের ধরন, বিশ্রামের সুযোগ এবং অসুস্থ হলে ছুটি নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার, কারখানার মালিক ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ইউনিক্লো বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সৌরভ কুমার মৈত্র, ওয়াইজেন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রবিন এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ আরিফুল ইসলাম।

