তৈরি পোশাকের বাইরে চামড়া, পাট, ওষুধ ও আইটি সেবায় রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ; উৎপাদন ও জ্বালানি খাতে জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্ব
জাপানের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত কার্যকর করা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ জন্য চুক্তির প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা এবং এর সুবিধাগুলো কাজে লাগাতে ব্যবসায়ীদের প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ঢাকায় জাপান দূতাবাস।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রশ্নের লিখিত জবাবে দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগ জানিয়েছে, চুক্তির সুফল বাস্তব অর্থনৈতিক অর্জনে রূপ দিতে ব্যবসায়ীদের এর বিভিন্ন বিধান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। বিশেষ করে শুল্কসুবিধা ও পণ্যের উৎপত্তির নিয়ম সম্পর্কে যথাযথ তথ্য জানানো জরুরি।
ইপিএ দ্রুত কার্যকরে গুরুত্ব
২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত ইপিএ বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। চুক্তিটির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে একটি বিস্তৃত কাঠামো তৈরি হয়েছে।
জাপান দূতাবাস জানায়, চুক্তিটি কার্যকর হলে সম্মত শুল্কসূচি অনুযায়ী অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি সেবা, বিনিয়োগ, শুল্কপ্রক্রিয়া, ই-কমার্স ও মেধাস্বত্বের মতো বিষয়ে বিধান থাকায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমে পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়বে।
দূতাবাসের ভাষ্য, ‘এ মুহূর্তে অগ্রাধিকার হলো চুক্তিটি দ্রুত কার্যকর করা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।’ এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পাশাপাশি চুক্তির সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যবসায়ীদের প্রস্তুত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এসএমই খাতে সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ
চুক্তির সুবিধা আরও বেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে দিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (এসএমই) মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে দূতাবাস। এ বিষয়ে প্রচার ও তথ্য সরবরাহের উদ্যোগ বাড়ানো গেলে আরও বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নতুন বাণিজ্য কাঠামোর আওতায় আসতে পারবে বলে মনে করে তারা।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) শ্রেণি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির প্রেক্ষাপটেও ইপিএ বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। দূতাবাসের মতে, চুক্তিটি রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব পরিকল্পনায় আরও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।
চুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্য বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুফল পেতে দুই দেশের সরকার ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপ জরুরি বলেও জানিয়েছে দূতাবাস।
চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর বাস্তবায়নসংক্রান্ত সমস্যা সমাধান এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে উভয় পক্ষ যৌথ কমিটিসহ বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলো কাজে লাগাতে পারবে।
তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণের সুযোগ
জাপানের বাজারে তৈরি পোশাকের (আরএমজি) বাইরে বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে দূতাবাস। এ ক্ষেত্রে চামড়াজাত পণ্য, পাটজাত পণ্য, ওষুধ ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবাকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে গাড়ির যন্ত্রাংশসহ উৎপাদনশিল্পের প্রাথমিক পর্যায়ের বিভিন্ন খাতের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছে দূতাবাস।
তবে জাপানের বাজারে প্রবেশ বাড়াতে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের সে দেশের চাহিদা ও নিয়মকানুন সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হবে। একই সঙ্গে পণ্যের মান ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখা, নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ, শ্রম ও পণ্যের মানসংক্রান্ত প্রযোজ্য বিধিবিধান মেনে চলা জরুরি।
বিশেষ করে ওষুধ রপ্তানির ক্ষেত্রে জাপানের পণ্য অনুমোদন এবং উৎপাদনের গুণগত মানসংক্রান্ত শর্ত পূরণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে দূতাবাস।
উৎপাদন ও জ্বালানি খাতে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উৎপাদনশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ভোগ্যপণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, সরবরাহ ও পরিবহনসেবা এবং জ্বালানির কথা জানিয়েছে দূতাবাস।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (বিএসইজেড) জাপানি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হতে পারে।
দূতাবাসের মতে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করা গেলে জাপানি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে নতুন কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা এবং বিদ্যমান বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আরও উৎসাহিত হবেন।
ইপিএর পাশাপাশি শিল্প খাতে সহযোগিতা জোরদার এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা গেলে বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও গভীর হবে বলে মনে করে দূতাবাস।

