বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মিথেন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণের বিধিনিষেধ শিথিল করছেন ট্রাম্প

জ্বালানি উৎপাদনকারীদের ব্যয় কমানোর দাবি

যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মিথেন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে থাকা বিধিনিষেধ ব্যাপকভাবে শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, এর ফলে ভোক্তা ও জ্বালানি উৎপাদকদের ৪৫ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে। তবে পরিবেশবিষয়ক গবেষকদের আশঙ্কা, এই পদক্ষেপে তেল ও গ্যাস খাতে শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

মঙ্গলবার টেক্সাসের লুবকে অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনের সমর্থনে আয়োজিত এক সমাবেশে ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন প্যাক্সটন। এ নির্বাচনে তাঁকে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। লুবক থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

বাইডেন আমলের বিধিনিষেধ বাতিলের ঘোষণা

সাবেক ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে তেল ও গ্যাস খাতের মিথেন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে এসব বিধিনিষেধ চালু করা হয়েছিল। সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘ভোক্তা ও জ্বালানি উৎপাদকদের ৪৫ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে আজ রাতে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে বাইডেনের ব্যয়বহুল ও অপ্রয়োজনীয় মিথেনসংক্রান্ত বিধিনিষেধ বাতিল করছি।’

উপস্থিত জনতার উল্লাসের মধ্যে তিনি আরও বলেন, এ পদক্ষেপের ফলে টেক্সাসের বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন ও ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে টেক্সাসেই সবচেয়ে বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদিত হয়।

চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ) প্রকাশিত এক বিবৃতিতেও ৪৫ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের একই হিসাব তুলে ধরা হয়েছিল। তবে কীভাবে এই সাশ্রয় হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

ইপিএর প্রশাসক লি জেলডিন বলেন, শীতকালে ঘর গরম রাখা, গাড়িতে জ্বালানি ভরা এবং কর্মস্থলে যাতায়াতের ব্যয় যেন মার্কিন নাগরিকদের সাধ্যের মধ্যে থাকে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, জ্বালানি উৎপাদকদের ওপর অপ্রয়োজনীয় বোঝা চাপানো হলে এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

মধ্যবর্তী নির্বাচন ও জ্বালানির দাম

মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানির দাম কমানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছেন ট্রাম্প। ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর শুরু করা যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

জনমত জরিপের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী সপ্তাহের নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতছাড়া হয়ে ডেমোক্র্যাটদের কাছে চলে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বৈশ্বিক উষ্ণতায় মিথেনের ভূমিকা

প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উপাদান মিথেন একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। কার্বন ডাই-অক্সাইডের পর বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম ভূমিকা রাখে। প্রাক্-শিল্প যুগের পর থেকে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির মোট প্রভাবের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ প্রায় শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতার জন্য মিথেন দায়ী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মিথেনের একটি অণু কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় বেশি তাপ আটকে রাখতে পারে। তবে বায়ুমণ্ডলে মিথেন সাধারণত সাত থেকে ১২ বছর স্থায়ী হয়। অন্যদিকে, কার্বন ডাই-অক্সাইড শত শত বছর পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে থাকতে পারে।

ভূগর্ভ থেকে তেল ও গ্যাস উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন এবং বিতরণের বিভিন্ন পর্যায়ে মিথেন নিঃসরণ ঘটে। নতুন পরিবর্তনগুলোর মূল লক্ষ্য এসব কার্যক্রম থেকে নির্গমন নিয়ন্ত্রণের নিয়ম শিথিল করা।

পরিবেশবিষয়ক গবেষকদের উদ্বেগ

তেল ও গ্যাস খাতের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ফিল্ডনোটসের গবেষক জুলিয়া কেইন এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, লি জেলডিনের নেতৃত্বাধীন ইপিএ তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে চাওয়া সুবিধা দিচ্ছে।

কেইনের মতে, নতুন ব্যবস্থায় কোম্পানিগুলো নিজেদের কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় রয়েছে বলে দাবি করতে পারবে, অথচ বিপুল পরিমাণ মিথেন নিঃসরণ ও পুড়িয়ে ফেলার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সুযোগ পাবে। তাঁর আশঙ্কা, এতে মিথেন নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, তেল ও গ্যাস খাত থেকে মিথেন নিঃসরণে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া।

যেসব নিয়ম শিথিল করার উদ্যোগ

নতুন পরিবর্তনের মধ্যে ‘সুপার এমিটার প্রোগ্রাম’ বাতিলের প্রস্তাব রয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় ইপিএ অনুমোদিত পর্যবেক্ষকেরা ঘণ্টায় ১০০ কেজির বেশি মিথেন নিঃসরণকারী বড় ধরনের গ্যাস লিকের ঘটনা শনাক্ত করে কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারেন।

এ ছাড়া ‘প্রান্তিক কূপ’ বা স্বল্প উৎপাদনশীল তেল ও গ্যাসকূপের ওপর থাকা বিধিনিষেধ শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কূপ থেকে দৈনিক ১৫ ব্যারেল বা তার কম তেলসমতুল্য জ্বালানি উৎপাদিত হয়।

তেল উত্তোলনের সময় উপজাত হিসেবে পাওয়া গ্যাস নিয়মিত পুড়িয়ে ফেলার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ শিথিল করা হবে। এসব পরিবর্তনের ফলে জ্বালানি উৎপাদনকারীদের পরিচালন ব্যয় কমতে পারে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও, মিথেন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন