শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

বন্ধ সরকারি কারখানায় ফিরছে উৎপাদন, ৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান

প্রাণ-আরএফএলের উদ্যোগে রাজশাহীর দুই কারখানায় নতুন প্রাণ, কর্মীদের ৯০ শতাংশই নারী; আরও ১৫ হাজার কর্মসংস্থানের লক্ষ্য

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা সরকারি শিল্পকারখানাগুলোতে আবারও উৎপাদন শুরু হচ্ছে। অব্যবহৃত সরকারি শিল্পসম্পদ কাজে লাগিয়ে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বেসরকারি বিনিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনায় রাজশাহীর দুটি বন্ধ কারখানায় ইতোমধ্যে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, যাদের প্রায় ৯০ শতাংশ নারী।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় বন্ধ শিল্পকারখানাগুলো ইজারা নিয়ে পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল। এসব কারখানায় উৎপাদিত পণ্য দেশের বাজারে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া বক্তব্যে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল জানিয়েছেন, রাজশাহীর বরেন্দ্র রাজশাহী টেক্সটাইল লিমিটেড ও রাজশাহী জুট মিলস লিমিটেড ইজারা নিয়ে নতুনভাবে উৎপাদন কার্যক্রম গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে জুতা, লাগেজ, নারীদের ব্যাগ, তাঁবু ও ছাতাসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, কারখানা দুটির উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়ানো হবে। নতুন উৎপাদন লাইন স্থাপনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বন্ধ সরকারি শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের একটি অংশ। সেই পরিকল্পনার আওতায় সরকারি মালিকানাধীন বন্ধ কারখানাগুলো বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রাণ-আরএফএল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত আগস্টে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন আরও দুটি পাটকল ইজারা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে কারখানা দুটি হস্তান্তর করা হয়। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে সেগুলোতেও উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।

কামরুজ্জামান কামালের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের আহ্বানে আবেদন করে নির্ধারিত শর্ত পূরণের পর প্রাথমিকভাবে ৩০ বছরের জন্য কারখানাগুলোর ইজারা পেয়েছে প্রাণ-আরএফএল। এর ফলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণ কিংবা সম্পূর্ণ শিল্প অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়াই বিদ্যমান স্থাপনা ব্যবহার করে উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে।

তিনি জানান, বন্ধ কারখানাগুলোতে আগে থেকেই ভবন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও যোগাযোগব্যবস্থার মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর বড় অংশ রয়েছে। এসব সুবিধা কাজে লাগিয়ে তুলনামূলক কম বিনিয়োগে দ্রুত উৎপাদন শুরু করা যায়। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত সরকারি সম্পদও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে।

কারখানাগুলো পুনরায় চালুর ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একসময় এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের নানা ক্ষেত্র। উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সংশ্লিষ্ট এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও তাদের পরিবারগুলো।

নতুন করে উৎপাদন শুরুর ফলে স্থানীয় শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরিবহন, কাঁচামাল সরবরাহ ও অন্যান্য সহযোগী ব্যবসায়ও কার্যক্রম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে নারী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে রাজশাহীর কারখানা দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছে প্রাণ-আরএফএল। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে কর্মরত প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিকের মধ্যে আনুমানিক সাড়ে চার হাজারই নারী।

কামরুজ্জামান কামাল জানান, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ায় অনেক নারীকে জীবিকার জন্য ঢাকা কিংবা অন্য বড় শহরে যেতে হচ্ছে না। নিজ এলাকায় কাজের সুযোগ পাওয়ায় পারিবারিক আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও অর্থের প্রবাহ বাড়ছে।

তবে বন্ধ শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে কিছু প্রতিবন্ধকতার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। বিশেষ করে যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বড় অঙ্কের বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেন।

খুলনার স্টার জুট মিলের যোগাযোগ সড়ক দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন হলে সেখানে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও অনুকূল হবে।

পাশাপাশি বন্ধ সরকারি কারখানা চালু করতে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সুবিধা, বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থার সহজীকরণ এবং বিনিয়োগ প্রণোদনার ওপর গুরুত্ব দেন প্রাণ-আরএফএলের এই কর্মকর্তা।

তার মতে, প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা পাওয়া গেলে আরও বেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ সরকারি শিল্পকারখানায় বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। এতে নতুন শিল্প অবকাঠামো নির্মাণের চাপ কমার পাশাপাশি উৎপাদন ও রপ্তানির সুযোগ বাড়বে।

সরকারের সহযোগিতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, বন্ধ মিলগুলো দ্রুত চালুর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগও এ ধরনের বিনিয়োগে সহায়ক হতে পারে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সরকারি কারখানাগুলোকে আবার উৎপাদনে ফেরানো গেলে শিল্পায়নের সুফল রাজধানী ও বড় শিল্পাঞ্চলের বাইরেও ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এ উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে কারখানাগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, বাজার সম্প্রসারণ, শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের শর্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ওপর।

প্রাণ-আরএফএল কর্তৃপক্ষের আশা, বিদ্যমান কারখানাগুলোর উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং নতুন ইজারা পাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চালু করা সম্ভব হলে আগামী দিনে কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতে আরও বড় অবদান রাখা যাবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন