আজ ৯ অক্টোবর, শুক্রবার, বিশ্ব ডিম দিবস। ডিমের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সুষম খাদ্যাভ্যাসে এর গুরুত্ব তুলে ধরা এবং সবার জন্য পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির ৩০তম বার্ষিকী। এবারের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য—‘প্রোটিন দ্যাট পাওয়ার্স অ্যান্ড প্রোটেক্টস’, যার বাংলা অর্থ ‘শক্তি জোগায় ও সুরক্ষা দেয় যে প্রোটিন’।
বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে পুষ্টিবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ডিমের পুষ্টিগুণ, সুষম খাদ্যাভ্যাসে এর ভূমিকা এবং নিরাপদ খাদ্য গ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরছেন। একই সঙ্গে ডিমের বাজারমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা, উৎপাদকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং পোলট্রি খাতের টেকসই উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
ডিম সহজলভ্য, বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য এবং পুষ্টিকর একটি খাবার। এতে উচ্চমানের প্রোটিনসহ শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ উপাদান রয়েছে। শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, পেশি গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতে ডিম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তুলনামূলক সহজে বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে ডিম খাওয়ার সুযোগ থাকায় দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় এটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
ডিমে থাকা উচ্চমানের প্রোটিন শরীরের কোষ ও পেশি গঠন এবং ক্ষয়পূরণে সহায়তা করে। এ ছাড়া এতে রয়েছে কোলিন, ভিটামিন বি১২, ভিটামিন ডি ও সেলেনিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান।
কোলিন মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভিটামিন বি১২ স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়তা করে। অন্যদিকে, ভিটামিন ডি হাড়ের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে এবং সেলেনিয়াম শরীরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।
শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সময় পর্যাপ্ত পুষ্টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সুষম খাদ্যতালিকায় ডিম অন্তর্ভুক্ত করা হলে তাদের প্রোটিন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের চাহিদা পূরণে সহায়তা হতে পারে। একইভাবে, প্রাপ্তবয়স্কদের পেশি বজায় রাখা এবং দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদা পূরণেও ডিম কার্যকর খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে সুস্থ থাকার জন্য কেবল একটি খাবারের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। বরং শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, মাছ, দুধ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের সমন্বয়ে বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা ও পুষ্টির চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যতালিকায় ডিমের পরিমাণ নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব ডিম দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ডিমের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এ খাবার নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা। ডিম সিদ্ধ, ভাজি, পোচ কিংবা বিভিন্ন খাবারের উপকরণ হিসেবে সহজেই খাওয়া যায়। তবে পুষ্টিগুণের পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নিরাপদে ডিম খাওয়ার জন্য ভালোভাবে রান্না করে গ্রহণ করা, পরিষ্কার হাতে ডিম প্রস্তুত করা এবং সংরক্ষণের সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা জরুরি। ফাটা বা দূষিত ডিম এড়িয়ে চলা এবং কাঁচা ডিমের সংস্পর্শে আসা পাত্র ও রান্নার সরঞ্জাম পরিষ্কার রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব সতর্কতা খাদ্যবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
বাংলাদেশেও ডিমের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ওয়ার্ল্ডস পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশনের বাংলাদেশ শাখা এবং বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের উদ্যোগে দিবসটি ঘিরে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে র্যালি, আলোচনা সভা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুষ্টিবিষয়ক কার্যক্রম। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ডিমের পুষ্টিগুণ, শিশুদের বিকাশে প্রোটিনের প্রয়োজনীয়তা এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুষ্টিকর খাবারের উপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সেই খাবার মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখাও জরুরি। কারণ, খাদ্যের পুষ্টিমান সম্পর্কে ধারণা থাকলেও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করতে পারে না। তাই জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি সাশ্রয়ী দামে ডিমের সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে প্রায় ২ হাজার ৫০৯ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়েছে। একই সময়ে দেশে ডিমের বার্ষিক চাহিদা ছিল প্রায় ১ হাজার ৮৫৫ কোটি।
উল্লিখিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। তবে উৎপাদনের পরিমাণ বেশি হলেই বাজারে সব সময় সাশ্রয়ী দামে ডিম পাওয়া নিশ্চিত হয় না। উৎপাদন ব্যয়, খাদ্য ও কাঁচামালের দাম, পরিবহন, সংরক্ষণ, মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় ডিমের খুচরা মূল্যকে প্রভাবিত করতে পারে।
এ অবস্থায় ডিম উৎপাদকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য সাশ্রয়ী দামে পুষ্টিকর খাবারের সরবরাহ নিশ্চিত করা জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
উৎপাদন ও চাহিদার পরিসংখ্যান নিয়মিত হালনাগাদ করা, বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা বাড়ানো গেলে নীতিনির্ধারকদের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করাও জরুরি।
বাংলাদেশের পোলট্রি খাত খাদ্য সরবরাহ, গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এ খাতের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, খামারি, শ্রমিক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জীবিকা নির্বাহ করেন। ফলে ডিমের উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখা শুধু পুষ্টি নিশ্চিত করার জন্য নয়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
এ খাতের টেকসই উন্নয়নে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখা, পোলট্রি রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, নিরাপদ উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
পাশাপাশি ডিম উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনের প্রতিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করতে হবে। আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা, মানসম্মত পরিবহন এবং যথাযথ বাজার তদারকি জোরদার করা গেলে অপচয় কমানো ও ভোক্তাদের কাছে নিরাপদ ডিম পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে।
খামারিদের উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়তা, রোগ নিয়ন্ত্রণে কারিগরি পরামর্শ এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব সম্পর্কে কার্যকর নজরদারিও এ খাতের স্থিতিশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্ব ডিম দিবসের তাৎপর্য কেবল একটি খাবারের পুষ্টিগুণ প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সবার জন্য পুষ্টিকর খাবারের সহজলভ্যতা, শিশুদের সুস্থ বিকাশ, নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা এবং কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের টেকসই উন্নয়নের প্রশ্ন।
ডিমের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে বাজারব্যবস্থাপনা উন্নত করা, উৎপাদকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সরকারি প্রতিষ্ঠান, পোলট্রি শিল্প, খামারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্ব ডিম দিবস তাই পুষ্টিকর খাবার গ্রহণে মানুষকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি এমন একটি খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানায়, যেখানে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার শুধু সচেতন মানুষের পছন্দের বিষয় নয়, বরং সব শ্রেণির মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে।

