স্থলবন্দরের বাধা, পাটপণ্যে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক ও বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে আলোচনা; অমীমাংসিত সমস্যা দ্রুত সমাধানে দুই দেশের ঐকমত্য, আজ শেষ হচ্ছে বৈঠক
প্রায় তিন বছর বিরতির পর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাণিজ্য ওয়ার্কিং গ্রুপের ১৬তম বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা দূর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে দুই দেশ। বিশেষ করে ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশে বিদ্যমান বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক করা এবং পাটজাত পণ্যের ওপর আরোপিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক পুনর্বিবেচনার দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেছে ঢাকা।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) নয়াদিল্লিতে শুরু হওয়া দুই দিনের বৈঠক শুক্রবার শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রথম দিনের আলোচনায় উভয় পক্ষ দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বাণিজ্যিক সমস্যা নিয়মিত ও গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে একমত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা শুল্ক কমানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আয়েশা আক্তারের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ১০ সদস্যের সরকারি প্রতিনিধিদল বৈঠকে অংশ নিয়েছে। প্রতিনিধিদলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের কর্মকর্তারা রয়েছেন।
নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার সাইদুর রহমানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বন্দরসংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পণ্যের মান ও শ্রেণিবিন্যাসে সামঞ্জস্য আনা, স্থল শুল্ক স্টেশনের মাধ্যমে বাণিজ্য সহজ করা, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ নীতিতে থাকা প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং আঞ্চলিক মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থার নিয়মকানুন সহজ করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
ভারতীয় প্রতিনিধিদলও তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয় উত্থাপন করেছে। এর মধ্যে সুতা ও অন্যান্য পণ্যের ওপর বিদ্যমান বন্দরসংক্রান্ত বিধিনিষেধ, পণ্যের মান নির্ধারণে জটিলতা এবং রেল ও অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্য পরিবহনের বিষয় রয়েছে।
দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কে নতুন জটিলতা তৈরি হয় ২০২৫ সালে। ওই বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশ বেনাপোল, ভোমরা, সোনামসজিদ, বাংলাবান্ধা ও বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয়। তবে সমুদ্রপথে আমদানির সুযোগ বহাল থাকে।
এর কয়েক সপ্তাহ পর ভারতও স্থলপথে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক ও পিভিসিসহ কয়েকটি পণ্যের আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। পরবর্তী সময়ে পাট ও কিছু বস্ত্রজাত পণ্যের ক্ষেত্রেও নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর হয়।
এসব পদক্ষেপের ফলে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য পণ্য পরিবহন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে নতুন জটিলতা তৈরি হয়। বিশেষ করে স্থলপথের পরিবর্তে সমুদ্রপথ ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা পরিবহন ব্যয় ও সময়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে বর্তমান বৈঠকে এসব বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের বিষয়টি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দাবি হিসেবে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের পাটজাত পণ্যের ওপর ভারতের আরোপিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে এই শুল্ক পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে আসছে। পাটপণ্যের অন্যতম রপ্তানি বাজার ভারতে অতিরিক্ত শুল্ক থাকলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পরও ভারতীয় বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার অব্যাহত রাখার বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই দুটি বিষয় বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় বাজারে প্রবেশের সুবিধা অব্যাহত থাকা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়লে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের পথ আরও সহজ হতে পারে। তবে এসব বিষয়ে কার্যকর পরিবর্তনের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনা ও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ রপ্তানির তুলনায় বেশি হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। বাংলাদেশ এই ব্যবধান কমাতে রপ্তানি বাড়ানো, অশুল্ক বাধা দূর এবং পণ্য পরিবহন সহজ করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি হয়েছে ৩৩ কোটি ৫২ লাখ ডলারের সমপরিমাণ, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেশি। রপ্তানি বৃদ্ধির এই প্রবণতার মধ্যেই দুই দেশের বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা দূর করার আলোচনা নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।
এদিকে নয়াদিল্লির বৈঠককে কেন্দ্র করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেও দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস ৬ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, বাণিজ্য ও কনস্যুলার বিষয়ক প্রাতিষ্ঠানিক বৈঠকগুলো পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা ও নয়াদিল্লি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাণিজ্য ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকের পর দুই দেশের বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে বাংলাদেশ আগ্রহী। তবে ভারতীয় পক্ষ ট্রানজিট ও সীমান্ত বাণিজ্যসংক্রান্ত অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা আগে সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
একই সঙ্গে ভিসাসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য পৃথক কনস্যুলার ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক আয়োজনের বিষয়েও দুই দেশ কাজ করছে। রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে বাণিজ্য ও কনস্যুলার পর্যায়ের এই যোগাযোগকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমটি।
বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বাণিজ্য ওয়ার্কিং গ্রুপের সর্বশেষ ১৫তম বৈঠক হয়েছিল ২০২৩ সালের ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায়। তার আগে ২০২২ সালের মার্চে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয় ১৪তম বৈঠক। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবছর এই বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও দুই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সম্পর্কের পরিবর্তনের কারণে গত তিন বছর তা অনুষ্ঠিত হয়নি।
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে শীতলতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব পড়ে নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগেও। এর মধ্যে ২০২৫ সালে উভয় দেশের বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি করে।
তবে গত ২৪ আগস্ট বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকে বন্ধ সীমান্ত হাট পুনরায় চালু, স্থলবন্দরগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক করা এবং সুতা আমদানির বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের মতো বিষয়গুলো আলোচনায় আসে। ওই বৈঠকের ধারাবাহিকতায় নয়াদিল্লির বর্তমান আলোচনা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে।
অবশ্য যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক মূলত দুই দেশের বাণিজ্যিক সমস্যা চিহ্নিত করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের অবস্থান তুলে ধরা এবং সমাধানের পথ নিয়ে আলোচনা করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। এটি সরাসরি সব ধরনের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ফোরাম নয়।
বৈঠকে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সমস্যা আলোচনায় তুলছে। তবে বৈঠকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের চেয়ে আলোচনা ও পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের একটি প্ল্যাটফর্ম।
ফলে নয়াদিল্লির দুই দিনের বৈঠক শেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে, বন্দরসংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, পাটপণ্যে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক এবং স্থলপথে পণ্য পরিবহনের জটিলতা নিরসনে দুই দেশ সুনির্দিষ্ট কোনো পরবর্তী পদক্ষেপ ঘোষণা করে কি না।
প্রথম দিনের আলোচনায় অমীমাংসিত সমস্যা দ্রুত সমাধানের বিষয়ে দুই পক্ষের সম্মতি পাওয়া গেলেও বাস্তবে এসব বাধা কতটা দূর হবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ও তার বাস্তবায়নের ওপর

