শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

জ্বালানি সরবরাহ ঠিক রাখতে ৩.১ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিল সরকার

দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির জন্য ৩.১ বিলিয়ন ডলারের একটি ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করেছে সরকার। জ্বালানি সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন তৈরি না হয় এবং আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখা যায়, সে লক্ষ্যেই এই অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

৮ অক্টোবর নন-কনসেশনাল ঋণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি এই বৈদেশিক ঋণ অনুমোদন করেছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বাণিজ্যিক শর্তে নেওয়া এই ঋণ জ্বালানি খাতে সরকারের অর্থায়ন সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহার করা হবে।

এই অর্থায়ন দিচ্ছে সৌদি আরবের জেদ্দাভিত্তিক আন্তর্জাতিক ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইটিএফসি)। প্রতিষ্ঠানটি ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গ্রুপের একটি বাণিজ্য অর্থায়নকারী সংস্থা।

চুক্তি অনুযায়ী, ঋণের অর্থ দুই রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবহার করা হবে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি তেল আমদানির জন্য পাবে ২.৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে পেট্রোবাংলা এলএনজি কেনার জন্য ব্যবহার করবে ৬০০ মিলিয়ন ডলার।

এই ঋণ সরাসরি একক উৎস থেকে আসছে না। এটি যৌথ অর্থায়ন কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হবে। আইটিএফসি নিজস্ব তহবিল থেকে ৬০০ মিলিয়ন ডলার সরবরাহ করবে এবং বাকি ২.৫ বিলিয়ন ডলার বা মোট ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশ অর্থায়ন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় মাস মেয়াদি টার্ম SOFR-এর সঙ্গে অতিরিক্ত ১.৭০ শতাংশ যোগ করে। এর পাশাপাশি বছরে ০.২০ শতাংশ প্রশাসনিক ফি দিতে হবে। ১ অক্টোবরের ছয় মাস মেয়াদি SOFR হার ৩.৬৮ শতাংশ ধরে হিসাব করলে ঋণের আনুমানিক সুদের হার দাঁড়ায় প্রায় ৫.৩৮ শতাংশ।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ঋণের মার্জিন গত বছরের তুলনায় ০.০৫ শতাংশ পয়েন্ট কম। অর্থাৎ আগের তুলনায় কিছুটা কম খরচে এই অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ঋণের পরিশোধ কাঠামোও কিছুটা ভিন্ন ধরনের। প্রতিটি অর্থ ছাড়ের পর ছয় মাস শেষে পুরো অর্থ একবারে পরিশোধ করতে হবে। তবে নির্ধারিত সময় শেষে ঋণ নবায়ন বা রোলওভার করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কমিটির নথি অনুযায়ী, এই ব্যবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের এককালীন দায় প্রায় ১৯৫ মিলিয়ন ডলারের মতো থাকতে পারে। তবে নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধে কোনো সমস্যা হলে এই দায় সর্বোচ্চ ১.২৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।

জ্বালানি আমদানির জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য পরিবর্তন, ডলারের বিনিময় হার এবং আমদানি ব্যয়ের ওঠানামা দেশের জ্বালানি খাতের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতের কার্যক্রম সচল রাখতে জ্বালানি তেল ও এলএনজির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ প্রয়োজন। এ কারণে সরকার নিয়মিতভাবে বৈদেশিক অর্থায়নের মাধ্যমে জ্বালানি আমদানির অর্থপ্রবাহ বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

জানা গেছে, জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রাখতে ঋণ প্রস্তাবটি জরুরি ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা হয়। কমিটির চেয়ারম্যানের অনুমোদনের পর পূর্ণ কমিটি এই অর্থায়ন অনুমোদন করে। এর আগে গত ২৯ জুন দুই পক্ষের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ঋণের পরিমাণ ও অর্থায়নের কাঠামো নিয়ে প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছিল।

বাংলাদেশের ঋণ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী, যেসব বৈদেশিক ঋণের গ্র্যান্ট এলিমেন্ট বা অনুদান অংশ ২৫ শতাংশের নিচে থাকে, সেগুলোকে নন-কনসেশনাল ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব ঋণের ক্ষেত্রে সরকারের ওপর তুলনামূলক বেশি আর্থিক চাপ থাকায় বিশেষ নজরদারি রাখা হয়।

নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের ঋণের বার্ষিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ রপ্তানি আয়ের ১০ শতাংশ অথবা রাজস্ব আয়ের ১৫ শতাংশের মধ্যে রাখতে হয়, যেটি কম হয় সেটি প্রযোজ্য হবে।

৩.১ বিলিয়ন ডলারের এই অর্থায়নের মাধ্যমে সরকার আপাতত জ্বালানি আমদানির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে চাইছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ঋণের খরচ, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং দেশের সামগ্রিক ঋণ ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন