শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

ঝাও ফুগাংয়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ: যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রমাণ চাইল ফিজি

ফিজিতে চীনা স্বার্থসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা এবং ঘুষের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে চীনা একটি সরকারি সংস্থার স্থানীয় পরিচালকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ চেয়েছে ফিজি সরকার। অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঝাও ফুগাং। অন্যদিকে, চীন বলেছে, দেশটির বিরুদ্ধে অপবাদ ও কুৎসা রটানোর বিরোধিতা করে বেইজিং।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ফিজিতে চীনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা এবং কথিত দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ফিজির মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা দিয়েছে। ফিজির রাজধানী সুভায় অবস্থিত ‘ওভারসিজ চাইনিজ সার্ভিস সেন্টার’-এর পরিচালক ঝাও ফুগাংয়ের বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। এ বিষয়ে অভিযোগের সমর্থনে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ সরবরাহের জন্য ওয়াশিংটনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ফিজি সরকার।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ঝাও ফুগাংয়ের বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ তোলে। ওয়াশিংটনের দাবি, ফিজির নাগরিকত্ব গ্রহণকারী ঝাও নিজের সরকারি পদমর্যাদা ব্যবহার করে চীনা সরকারের স্বার্থ, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর স্বার্থ এগিয়ে নিতে ঘুষ দিয়েছেন।

তবে ঝাওয়ের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ এখনো প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগের বিষয়ে তার পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়েছে এবং ফিজি সরকারও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

শুক্রবার ফিজি সরকার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, দেশটির অভ্যন্তরে সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ করা অপরাধের বিষয়ে ওয়াশিংটনকে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য বা প্রমাণ সরবরাহ করতে হবে। ফিজি সরকারের আনুষ্ঠানিক ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ অবস্থান তুলে ধরা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব আইন ও নীতিমালার আওতায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সার্বভৌম অধিকার ভোগ করে—এ বিষয়টি ফিজি সম্মান করে। তবে ফিজির ভূখণ্ডে সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ করা যেকোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডের নিষ্পত্তি দেশটির নিজস্ব আইনি কাঠামো এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে।

ফিজি সরকার আরও উল্লেখ করেছে, কোনো অভিযোগই অপরাধ সংঘটিত হওয়ার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। এ ধরনের অভিযোগের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ যেকোনো পদক্ষেপ নিলে সেখানে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, অভিযুক্ত ব্যক্তির নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার অধিকার এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে।

ফিজি সরকারের এই অবস্থানের মধ্য দিয়ে অভিযোগের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

ঝাও ফুগাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি নতুন নয়। ২০২৪ সালে অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্টের (ওসিসিআরপি) প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ফিজিতে চীনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনায় তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল।

ওই প্রতিবেদনে ঝাওকে ফিজির নাগরিকত্ব গ্রহণকারী ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে মানব পাচার, অর্থ পাচার এবং মাদক চোরাচালানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাকে সন্দেহ করত বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল।

তবে এসব অভিযোগ, সন্দেহ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধের সমতুল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত, উপস্থাপিত প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হওয়ার কথা।

ঝাও ফুগাংয়ের আইনজীবী নিখিল নাম্বিয়ার এএফপিকে জানিয়েছেন, তার মক্কেল তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন। বেইজিংয়ের পক্ষে প্রভাব বিস্তার করার অভিযোগকে তিনি ‘মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর’ বলে অভিহিত করেছেন।

অন্যদিকে, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঝাওয়ের মামলার বিস্তারিত তথ্য তাদের জানা নেই। তবে চীনের বিরুদ্ধে অপবাদ ও কুৎসা রটানোর বিরোধিতা করার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে মন্ত্রণালয়।

ফলে ঝাওয়ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, অভিযুক্তের পক্ষ থেকে তা প্রত্যাখ্যান এবং চীনের প্রতিক্রিয়া—এই তিনটি অবস্থানই বিষয়টিকে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে এবং ফিজি সরকার সেগুলোর ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেয়, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে নিজেদের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বাড়ানোর প্রচেষ্টা জোরদার করেছে চীন। অঞ্চলটিতে চীনের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ভৌগোলিক অবস্থান, সামুদ্রিক যোগাযোগ, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে অঞ্চলটির দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। চীনের সঙ্গে বিভিন্ন দ্বীপরাষ্ট্রের সম্পর্ক ও সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টি ওয়াশিংটন এবং ক্যানবেরার আঞ্চলিক নীতিতেও গুরুত্ব পাচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে ঝাও ফুগাংয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ শুধু একজন ব্যক্তির কথিত দুর্নীতির বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তার, বিদেশি স্বার্থসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও আইনি কর্তৃত্বের প্রশ্নকেও সামনে এনেছে।

তবে ঝাওয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের সঙ্গে চীনের আঞ্চলিক কৌশলগত তৎপরতার সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নীতিগত কার্যক্রম এক বিষয় নয়। তাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল বিবেচনা করা জরুরি।

ঝাও ফুগাংয়ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগের বিষয়ে ফিজি সরকারের প্রমাণ চাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘটনাটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একদিকে ওয়াশিংটন তার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছে, অন্যদিকে সুভা সরকার বলছে, ফিজির অভ্যন্তরে সংঘটিত কথিত অপরাধের নিষ্পত্তি হতে হবে দেশটির আইন ও যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসারে।

এখন অভিযোগের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ সরবরাহ করে, ফিজির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করে এবং পরবর্তী সময়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না—সেদিকেই নজর থাকবে।

সব মিলিয়ে, ঝাও ফুগাংকে ঘিরে এই ঘটনা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে একই আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তবে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণের জন্য প্রমাণভিত্তিক তদন্ত ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন