অনুসরণ করুন:
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬

এয়ারবাসের ১০ উড়োজাহাজ কিনছে বিমান, যুক্তরাজ্য–বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন সম্ভাবনা

ছয়টি এ৩২১নিও ও চারটি এ৩৫০-৯০০ কেনার চুক্তি; পাইলট, প্রকৌশলী ও রক্ষণাবেক্ষণকর্মীদের প্রশিক্ষণেও সহযোগিতা, বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিমান চলাচলকেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্য

বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতে বড় ধরনের সম্প্রসারণের উদ্যোগ হিসেবে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এর মধ্যে রয়েছে ছয়টি এয়ারবাস এ৩২১নিও (A321neo) এবং চারটি এ৩৫০-৯০০ (A350-900) উড়োজাহাজ।

বুধবার (৭ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে ব্রিটিশ পক্ষ।

চুক্তির আওতায় শুধু নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহ নয়, বিমানের পাইলট, প্রকৌশলী, কেবিন ক্রু ও রক্ষণাবেক্ষণকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সহযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে।

এয়ারবাসের নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ, যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন এবং বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমান চলাচলকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা জোরদার হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এক নজরে পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • ১০টি নতুন উড়োজাহাজ: চারটি এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১নিও কেনার চুক্তি।
  • দূরপাল্লার রুট সম্প্রসারণ: ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা।
  • দক্ষ জনবল তৈরিতে সহযোগিতা: পাইলট, প্রকৌশলী ও রক্ষণাবেক্ষণকর্মীদের প্রশিক্ষণ।
  • জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি: আগের প্রজন্মের উড়োজাহাজের তুলনায় জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনা।
  • বাংলাদেশ–যুক্তরাজ্য সহযোগিতা: বিমান পরিবহন, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে নতুন সুযোগ।

ঢাকায় আনুষ্ঠানিক চুক্তি

রাজধানীর র‍্যাডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান রুমী এ হোসেন এবং এয়ারবাসের ভারত ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট ইয়ুর্গেন ভেস্টারমায়ার নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এয়ারবাসের আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় জানানো হয়েছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা

বিমান ও এয়ারবাসের চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে ব্রিটিশ পক্ষ বলেছে, এই উদ্যোগ বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য উভয় দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং দক্ষতা উন্নয়নে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে বিমান পরিচালনা, প্রকৌশল, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণ খাতে সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে।

এয়ারবাস ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান হলেও এর উড়োজাহাজ নির্মাণ ও সরবরাহব্যবস্থায় যুক্তরাজ্যের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ রয়েছে। ফলে নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের এই উদ্যোগ যুক্তরাজ্যের বিমানশিল্পের জন্যও বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করতে পারে।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির রপ্তানি ঋণসহায়তা সংস্থাগুলোও এই উদ্যোগে সহযোগিতা করছে।

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে ব্রিটিশ পণ্য ও সেবার ব্যবহার বাড়াতে যুক্তরাজ্যের রপ্তানি অর্থায়নব্যবস্থার আওতায় সর্বোচ্চ ২০০ কোটি পাউন্ড পর্যন্ত সহায়তার সুযোগ রয়েছে। তবে এই পুরো অর্থ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজ কেনার জন্য নির্ধারিত নয়।

কোন উড়োজাহাজ কোথায় ব্যবহার হবে?

চুক্তির চারটি এয়ারবাস এ৩৫০-৯০০ মূলত দূরপাল্লার আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

এই উড়োজাহাজ দিয়ে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভবিষ্যতে অন্যান্য দূরবর্তী গন্তব্যে বিমান পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

অন্যদিকে ছয়টি এ৩২১নিও উড়োজাহাজ দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যম দূরত্বের আন্তর্জাতিক রুটে ব্যবহার করা যাবে।

এয়ারবাসের তথ্য অনুযায়ী, এ৩৫০ উড়োজাহাজ একটানা প্রায় ১৮ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত উড্ডয়নের উপযোগী। উন্নত প্রযুক্তি ও জ্বালানি সাশ্রয়ী ইঞ্জিনের কারণে এটি দীর্ঘ দূরত্বে তুলনামূলক দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা সম্ভব।

এ৩২১নিও উড়োজাহাজও আগের প্রজন্মের সমজাতীয় উড়োজাহাজের তুলনায় অন্তত ২০ শতাংশ কম জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণের সুবিধা দিতে পারে বলে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে।

পাইলট ও প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণে গুরুত্ব

নতুন উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল তৈরি করা চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন বহরের উপযোগী করে পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী এবং গ্রাউন্ড অপারেশনস কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

এয়ারবাসের সঙ্গে সহযোগিতার আওতায় উড়োজাহাজ পরিচালনা, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থার উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

এর ফলে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের বিমান পরিচালনা ও কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ সময়সূচি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা এবং ব্যয়সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হওয়ার লক্ষ্য

বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমান চলাচলকেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সম্ভাবনাময় সংযোগস্থল।

নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রুটে সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি যাত্রী ও কার্গো পরিবহনেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের মোট বিমানযাত্রীর প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। সরকার এই অংশীদারত্ব বাড়িয়ে অন্তত ৫০ শতাংশে উন্নীত করতে চায়।

এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের পাশাপাশি বিমানবন্দরের সক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সেবার মানোন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ।

কবে আসবে নতুন উড়োজাহাজ?

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন এয়ারবাস উড়োজাহাজগুলো ২০৩৩ সালের কাছাকাছি সময় থেকে বিমানের বহরে যুক্ত হতে পারে।

তবে সরকার আরও আগেই উড়োজাহাজ সরবরাহের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বিমানমন্ত্রী অন্তত একটি উড়োজাহাজ দ্রুত সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছেন।

উড়োজাহাজগুলোর চূড়ান্ত সরবরাহসূচি এবং ক্রয়চুক্তির মোট আর্থিক মূল্য প্রকাশ করা হয়নি।

বিমানের বহর সম্প্রসারণে বড় পরিকল্পনা

এয়ারবাসের সঙ্গে নতুন চুক্তির ফলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দীর্ঘমেয়াদি উড়োজাহাজ সংগ্রহ পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।

বর্তমানে সংস্থাটির বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর অধিকাংশই বোয়িং নির্মিত, পাশাপাশি রয়েছে ড্যাশ-৮ টার্বোপ্রপ উড়োজাহাজ।

এয়ারবাস যুক্ত হলে বিমানের বহরে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের বৈচিত্র্য বাড়বে। এতে বিভিন্ন দূরত্বের রুটের জন্য উপযোগী উড়োজাহাজ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে একাধিক নির্মাতার উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ, প্রকৌশল সহায়তা ও রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থার প্রয়োজন হবে। ফলে নতুন বহর পরিচালনার অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জন্য কতটা লাভজনক হবে চুক্তি?

বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের অর্থনৈতিক মূল্যায়নে এ ধরনের বড় উড়োজাহাজ ক্রয়চুক্তির সফলতা নির্ভর করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর। এর মধ্যে রয়েছে ক্রয়মূল্য, অর্থায়নের শর্ত, যাত্রীচাহিদা, রুটের লাভজনকতা, জ্বালানি ব্যয় এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ।

নতুন উড়োজাহাজ আন্তর্জাতিক বাজারে বিমানের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তবে শুধু উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়ালেই লাভজনকতা নিশ্চিত হয় না।

পরিকল্পিত রুট সম্প্রসারণ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত যাত্রী এবং সময়মতো উড়োজাহাজ সরবরাহের ওপর প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে।

এয়ারবাসের সঙ্গে ১০ উড়োজাহাজ কেনার এই চুক্তি তাই কেবল বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগ নয়; বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ, দক্ষ জনবল উন্নয়ন এবং ইউরোপের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন চুক্তির আর্থিক শর্ত, সরবরাহসূচি ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনাই নির্ধারণ করবে এর প্রকৃত সুফল কতটা পাবে বাংলাদেশ।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন