পর্ষদ পুনর্গঠনের পর বেক্সিমকোর দর বেড়েছে ১৪ শতাংশ, শাইনপুকুর সিরামিকসের প্রায় ১৫ শতাংশ
দেশের পুঁজিবাজারে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে বেক্সিমকো গ্রুপের তালিকাভুক্ত দুটি প্রতিষ্ঠান। পরিচালনা পর্ষদে বড় পরিবর্তনের পর বেক্সিমকো লিমিটেড ও শাইনপুকুর সিরামিকসের শেয়ারের দামে হঠাৎ ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। মাত্র দুই কার্যদিবসে প্রতিষ্ঠান দুটির শেয়ারদর বেড়েছে যথাক্রমে ১৪ ও ১৫ শতাংশের কাছাকাছি।
এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আলোচনায় রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি সালমান এফ রহমানের পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরে যাওয়া। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগে পর্ষদ পুনর্গঠনের পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কোম্পানি দুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
পর্ষদে পরিবর্তন, বাজারে দ্রুত প্রতিক্রিয়া
বেক্সিমকো গ্রুপের দুই কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন পর্ষদে সালমান এফ রহমানকে রাখা হয়নি।
এরপর বুধবার থেকেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ারের দাম বাড়তে শুরু করে। প্রথম দিন প্রতিটি শেয়ারের দর ৮০ পয়সা বৃদ্ধি পায়। পরদিন বৃহস্পতিবার লেনদেনের প্রথম ভাগেই দাম আরও প্রায় দুই টাকা বেড়ে যায়।
ফলে দুই দিনের ব্যবধানে বেক্সিমকোর প্রতিটি শেয়ারের বাজারমূল্য প্রায় তিন টাকা বেড়েছে, যা আগের দামের তুলনায় ১৪ শতাংশের বেশি।
একই ধরনের উত্থান দেখা গেছে গ্রুপটির আরেক প্রতিষ্ঠান শাইনপুকুর সিরামিকসের শেয়ারেও। বুধবার প্রায় ৯০ পয়সা বৃদ্ধির পর বৃহস্পতিবার লেনদেনের প্রথম দুই ঘণ্টায় শেয়ারটির দর আরও দুই টাকা ১০ পয়সা বাড়ে। সব মিলিয়ে দুই কার্যদিবসে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদর প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে।
লেনদেনেও বেক্সিমকোর দাপট
দামের পাশাপাশি শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণেও বেক্সিমকোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আগ্রহের প্রতিফলন দেখা গেছে।
বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ডিএসইতে প্রায় ২০ কোটি টাকার বেক্সিমকো শেয়ার লেনদেন হয়। ওই সময় লেনদেনের শীর্ষ অবস্থানে ছিল কোম্পানিটি।
অন্যদিকে প্রায় সাত কোটি টাকার লেনদেন নিয়ে শাইনপুকুর সিরামিকস ছিল সপ্তম স্থানে।
বাজারে এই সক্রিয়তা এমন এক সময়ে দেখা গেল, যখন বেক্সিমকো গ্রুপের ব্যবসায়িক ভবিষ্যৎ ও পরিচালন কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
বেক্সিমকোর তিন প্রতিষ্ঠান থেকেই সরলেন সালমান
সালমান এফ রহমানের পরিচালনা পর্ষদ থেকে বাদ পড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মাধ্যমে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ওই প্রতিষ্ঠানের পর্ষদ থেকেও তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
সর্বশেষ বেক্সিমকো লিমিটেড ও শাইনপুকুর সিরামিকসের পর্ষদ পুনর্গঠনের ফলে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত গ্রুপটির তিনটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদেই তার অবস্থানের অবসান ঘটেছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সালমান এফ রহমান ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গ্রেপ্তার হন। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
এর আগে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বিএসইসি তাকে পুঁজিবাজারে আজীবনের জন্য অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে।
নতুন পর্ষদ, তবে পুরোনো নেতৃত্বের সংশ্লিষ্টতা
পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের মাধ্যমে সালমান এফ রহমানকে সরিয়ে দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনায় তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি পুরোপুরি শেষ হয়নি।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পুনর্গঠিত পর্ষদে চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন তার ভাই এ এস এফ রহমান। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে রয়েছেন ওসমান কায়সার চৌধুরী।
ফলে পর্ষদের পরিবর্তন কোম্পানিগুলোর পরিচালননীতি ও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটি এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।
শেয়ারের উত্থান কি দীর্ঘস্থায়ী হবে?
পর্ষদে পরিবর্তনের পর শেয়ারদরের দ্রুত বৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের ইঙ্গিত দিলেও শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার উন্নতি নিশ্চিত করে না।
বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা, ঋণ ও দায় ব্যবস্থাপনা, আর্থিক প্রতিবেদন এবং নতুন পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষ করে স্বল্প সময়ে শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের জন্য কোম্পানির মৌলভিত্তি ও আর্থিক তথ্য পর্যালোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
পর্ষদ পুনর্গঠনের পর বাজারে যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক অগ্রগতিতে রূপ নেয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

