অনুসরণ করুন:
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬

গাজার হাসপাতালে সামরিক তৎপরতার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান হামাসের, প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন

ইসরায়েলের দাবি, কামাল আদওয়ান হাসপাতাল থেকে বিস্ফোরক নিয়ে বের হয়েছিলেন দুই ফিলিস্তিনি; হামাস বলছে, হাসপাতাল ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলার যৌক্তিকতা তৈরির চেষ্টা চলছে।

৮ অক্টোবর ২০২৬, আন্তর্জাতিক ডেস্ক, প্রান্তকাল

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত কামাল আদওয়ান হাসপাতাল সামরিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে—ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস। সংগঠনটি দাবি করেছে, হাসপাতাল ও বেসামরিক স্থাপনায় সামরিক অভিযানকে বৈধতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ইসরায়েল ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপন করছে।

তুরস্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কামাল আদওয়ান হাসপাতালের কাছে প্রাণঘাতী বিমান হামলার পর ইসরায়েলি বাহিনী চিকিৎসাকেন্দ্রটি সামরিক কাজে ব্যবহারের অভিযোগ তোলে। তবে হামাস এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে।

হাসপাতাল থেকে বিস্ফোরক নেওয়ার অভিযোগ ইসরায়েলের

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, কামাল আদওয়ান হাসপাতাল থেকে দুই ফিলিস্তিনি বের হয়ে আসেন। তাঁদের একজন হাসপাতাল কমপ্লেক্স থেকে আনা একটি বিস্ফোরক যন্ত্র স্থাপন করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

ইসরায়েলি বাহিনী জানায়, পরে বিমান হামলায় ওই দুই ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়।

নিহতদের একজনকে মোহাম্মদ তামুস হিসেবে শনাক্ত করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। তাদের দাবি, তিনি হামাসের সশস্ত্র শাখার সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্সের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।

তবে টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাসপাতালের ভেতরে বিস্ফোরক সংরক্ষণ কিংবা সেখান থেকে বিস্ফোরক সরবরাহের অভিযোগের পক্ষে ইসরায়েলি বাহিনী কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করেনি।

ফলে হাসপাতালটি সামরিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

‘হাসপাতালে হামলার অজুহাত তৈরি করছে ইসরায়েল’

ইসরায়েলের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে হামাস বলেছে, গাজার হাসপাতালগুলোতে সশস্ত্র যোদ্ধাদের অবস্থান এবং সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ নতুন নয়।

সংগঠনটির দাবি, এর আগেও বিভিন্ন হাসপাতালের ভেতরে সামরিক কমান্ড সেন্টার পরিচালনার অভিযোগ তুলেছিল ইসরায়েল। হামাসের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অভিযোগের অনেকগুলোর পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

হামাস অভিযোগ করেছে, চিকিৎসাকেন্দ্র, জরুরি উদ্ধারকর্মী এবং বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতেই এমন বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে।

তবে হামাসের এসব অভিযোগও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

আহতদের উদ্ধারের সময় আবারও বিমান হামলার অভিযোগ

টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদনে স্থানীয় একটি চিকিৎসা সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে, বুধবার কামাল আদওয়ান হাসপাতালের কাছে আহত ব্যক্তিদের উদ্ধারে নিয়োজিত এক ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্স চিকিৎসাকর্মী ইসরায়েলি বিমান হামলায় গুরুতর আহত হন।

পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

ওই চিকিৎসা সূত্রের দাবি, প্রথম হামলার পর আহতদের উদ্ধার করতে জরুরি সেবাকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান দ্বিতীয়বার হামলা চালায়।

এই অভিযোগ সত্য হলে তা সংঘাতপূর্ণ এলাকায় চিকিৎসাকর্মী ও উদ্ধারকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, চিকিৎসাকর্মী, রোগী ও চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান বিশেষ সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। কোনো হাসপাতাল সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় না।

গাজায় মানবিক বিপর্যয়

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে।

টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সংঘাত শুরুর পর থেকে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক লাখ ৭৫ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে গাজার বেসামরিক অবকাঠামোর প্রায় ৯০ শতাংশ ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব পরিসংখ্যানের সর্বশেষ অবস্থা ও গণনাপদ্ধতি পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গাজার সাধারণ মানুষের চিকিৎসাপ্রাপ্তি এবং জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

পাল্টাপাল্টি দাবির মধ্যে স্বাধীন তদন্তের গুরুত্ব

ইসরায়েলি বাহিনী দাবি করেছে, হাসপাতালটি থেকে তাদের সেনাদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল। অন্যদিকে হামাস অভিযোগ করেছে, হাসপাতালকে সামরিক স্থাপনা হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে চিকিৎসাকেন্দ্রে হামলার অজুহাত তৈরি করা হচ্ছে। উভয় পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে মৌলিক বিরোধ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, হাসপাতাল ও চিকিৎসাকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সংঘাতে জড়িত সব পক্ষের দায়িত্ব। কোনো চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তার যথাযথ প্রমাণ, হামলার সামরিক প্রয়োজনীয়তা এবং বেসামরিক মানুষের সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।

কামাল আদওয়ান হাসপাতাল ঘিরে সর্বশেষ ঘটনা আবারও গাজায় চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা এবং সামরিক অভিযানের জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন