বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়া ভারতে বসবাসের দায়ে সাজা; দারিদ্র্য বিবেচনায় জরিমানা অনাদায়ে অতিরিক্ত কারাভোগের মেয়াদ কমাল মাদ্রাজ হাইকোর্ট
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়া ভারতে প্রবেশ এবং দীর্ঘদিন বসবাসের অপরাধে তিন বাংলাদেশিকে দুই বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভারতের আদালত। দেশটির তামিলনাড়ু রাজ্যের তিরুপুরে প্রায় ছয় বছর ধরে বসবাস ও পোশাক কারখানায় কাজ করছিলেন তাঁরা। প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তাঁদের বিরুদ্ধে বিদেশি নাগরিকসংক্রান্ত আইনে মামলা করা হয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিম্ন আদালতের দেওয়া দুই বছরের কারাদণ্ড বহাল রেখেছেন মাদ্রাজ হাইকোর্ট। তবে দণ্ডিত ব্যক্তিদের দারিদ্র্য ও আর্থিক অসচ্ছলতা বিবেচনায় জরিমানা অনাদায়ে অতিরিক্ত কারাভোগের মেয়াদ কমানো হয়েছে।
বৈধ কাগজপত্র না থাকায় গ্রেপ্তার
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তামিলনাড়ুর তিরুপুর জেলার ইদুভামপালায়াম এলাকায় অভিযান চালায় বীরাপান্ডি থানার পুলিশ। এ সময় দুই পুরুষ ও এক নারীকে দুই শিশুসহ শনাক্ত করা হয়।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা নিজেদের বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন। তবে ভারতে প্রবেশ ও অবস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা কিংবা অনুমতিপত্র দেখাতে পারেননি।
পরে তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতের বিদেশি নাগরিকসংক্রান্ত আইনের ১৪এ(বি) ধারায় মামলা করা হয়।
ছয় বছর ধরে পোশাক কারখানায় কাজ
আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, তিন বাংলাদেশি প্রায় ছয় বছর ধরে তিরুপুরে বসবাস করছিলেন। সেখানে পোশাক কারখানায় দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তাঁরা।
অভিযুক্তদের আইনজীবীরা আদালতে জানান, বাংলাদেশের দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অনিশ্চিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাঁরা কাজের সন্ধানে ভারতে গিয়েছিলেন।
তাঁদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে অবস্থানের অভিযোগ ছাড়া অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ নেই বলেও দাবি করেন আইনজীবীরা।
নিম্ন আদালতে দুই বছরের সাজা
মামলার বিচার শেষে ২০২৫ সালের ১৪ অক্টোবর তিরুপুরের সংশ্লিষ্ট আদালত তিন বাংলাদেশিকে দোষী সাব্যস্ত করেন।
প্রত্যেককে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার ভারতীয় রুপি জরিমানা করা হয়। জরিমানা পরিশোধে ব্যর্থ হলে অতিরিক্ত কারাভোগের নির্দেশও দেওয়া হয়।
নিম্ন আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে মাদ্রাজ হাইকোর্টে আপিল করেন দণ্ডিত ব্যক্তিরা।
হাইকোর্টেও বহাল কারাদণ্ড
আপিলের শুনানিতে বিচারপতি এম. নির্মল কুমার মামলার নথি, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং অভিযুক্তদের আর্থিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন।
আদালত বিবেচনায় নেন, অভিযুক্তরা মূলত জীবিকার সন্ধানে ভারতে গিয়েছিলেন এবং দৈনিক মজুরির আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
তবে বৈধ ভ্রমণ নথি ছাড়া ভারতে অবস্থানের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দুই বছরের মূল কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়।
একই সঙ্গে প্রত্যেকের ১০ হাজার রুপি জরিমানাও বহাল থাকে। তবে জরিমানা দিতে না পারলে অতিরিক্ত কারাভোগের মেয়াদ কমিয়ে এক সপ্তাহ করেন হাইকোর্ট।
সাজা শেষে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ
মাদ্রাজ হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন, নির্ধারিত সাজা শেষ হওয়ার পর তিন বাংলাদেশিকে তাঁদের সঙ্গে থাকা দুই শিশুসহ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, সাজা শেষ হওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
এই রায়ের ফলে তিন বাংলাদেশির মূল কারাদণ্ড অপরিবর্তিত থাকলেও আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অতিরিক্ত কারাভোগের মেয়াদ কমেছে।
জীবিকার সন্ধানে ভারতে গিয়ে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া দীর্ঘদিন বসবাসের দায়ে তাঁদের কারাদণ্ড বহাল থাকল। এখন সাজা শেষে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষা।

