বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

১৬ হাজার ২০৭ কোটি টাকায় ১৩ প্রকল্প অনুমোদন, রামপালে হচ্ছে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ১৬ হাজার ২০৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে বাগেরহাটের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট পিক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্পও রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, প্রাথমিক জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানো এ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।

আজ বুধবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।

অনুমোদিত ১৩টি প্রকল্পের মধ্যে ১০টি নতুন, দুটি সংশোধিত এবং একটি প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্পগুলোর মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১০ হাজার ৬০০ কোটি ৮০ লাখ টাকা, প্রকল্প ঋণ ৪ হাজার ৮১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ১ হাজার ৫২৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

সভা শেষে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।

রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র

একনেক অনুমোদিত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘রামপাল ৪৪২ মেগাওয়াট পিক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ’ প্রকল্প। এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ২ হাজার ৪৯৮ কোটি ৮ লাখ টাকা।

বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। প্রকল্পে বিপিডিবির নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৭৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং পাওয়ার সেক্টর ডেভেলপমেন্ট ফান্ড থেকে ২ হাজার ১২৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা অর্থায়ন করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৯ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।

২ শতাংশ সুদে প্রকল্প ঋণ

রামপাল সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে পাওয়ার সেক্টর ডেভেলপমেন্ট ফান্ড থেকে নেওয়া ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ২ শতাংশ। ঋণ পরিশোধে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ মোট ১৬ বছর সময় পাওয়া যাবে।

প্রকল্পের অর্থায়ন কাঠামো অনুযায়ী, মোট ব্যয়ের বড় অংশই ঋণের মাধ্যমে নির্বাহ করা হবে। বাকি অর্থের একটি অংশ বিপিডিবির নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে।

বিপিডিবির ৯১৮ একর জমিতে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র

প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি রামপালের ব্লক-বি এলাকায় বিপিডিবির ইতোমধ্যে অধিগ্রহণ করা ৯১৮ দশমিক ৫০ একর জমিতে নির্মাণ করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, বিপিডিবির নিজস্ব জমি ব্যবহার করা হওয়ায় এ প্রকল্পের জন্য নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে কম থাকবে।

প্রকল্প দলিল অনুযায়ী, ব্লক-বি এলাকায় ভূমি উন্নয়ন ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

বিদ্যমান সঞ্চালন অবকাঠামো ব্যবহার

রামপাল সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিকটবর্তী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যমান সঞ্চালন অবকাঠামোর মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে।

প্রকল্পের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, বিদ্যমান সঞ্চালন অবকাঠামো ব্যবহার করা গেলে নতুন করে বড় ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন হবে না। ফলে প্রকল্পটি তুলনামূলক দ্রুত ও কম ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্ব

পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াবে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও এটি সহায়তা করবে।

পরিকল্পনা কমিশনের মতে, প্রকল্পটি দেশের প্রাথমিক জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ফলে কার্বন নিঃসরণ কমাতেও এটি ভূমিকা রাখবে।

রামপালের জমির বর্তমান ব্যবহার

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য বিপিডিবি ২০১২ সালে রামপালে মোট ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল। ওই জমি ৯১৫ দশমিক ৫০ একর আয়তনের ব্লক-এ এবং ৯১৮ দশমিক ৫০ একর আয়তনের ব্লক-বিতে ভাগ করা হয়।

ব্লক-এ বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেডের মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হয়েছে। আর ব্লক-বি বিপিডিবির আওতায় রয়েছে। এ ব্লকেই নতুন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সরকার খাতের সাত প্রকল্প

আজকের একনেক সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সাতটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত নতুন পাঁচটি অঞ্চলের ১৮টি ওয়ার্ডের সড়ক অবকাঠামো ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, রংপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রংপুর সিটি করপোরেশনের ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা পুনর্বাসন।

এ ছাড়া গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ৮ নম্বর জোনে রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণ এবং সমবায়ের মাধ্যমে নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে।

সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও নওগাঁ জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের দ্বিতীয় সংশোধনীও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

জলযান সংগ্রহ ও স্লিপওয়ে নির্মাণ

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ‘বিআইডব্লিউটিসির জন্য ৩৫টি বাণিজ্যিক ও ৮টি সহায়ক জলযান সংগ্রহ এবং দুটি নতুন স্লিপওয়ে নির্মাণ’ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পটি সংশোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) জলযান সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রেলওয়ের জন্য ৩০টি লোকোমোটিভ

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ‘রেলওয়ের সক্ষমতা সম্প্রসারণ প্রকল্প’-এর আওতায় বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহের প্রকল্পও একনেকের অনুমোদন পেয়েছে।

নতুন লোকোমোটিভ সংগ্রহের মাধ্যমে রেলওয়ের পরিচালন সক্ষমতা ও পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্যারিসে চ্যান্সারি ভবন সংস্কার

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের আওতায় ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ক্রয়কৃত চ্যান্সারি ভবন ব্যবহারোপযোগী করার জন্য সংস্কার ও আধুনিকায়ন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে।

এ প্রকল্পের মাধ্যমে ভবনটির প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজ সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সড়ক ও সেতু খাতে দুটি প্রকল্প

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্পও একনেকের অনুমোদন পেয়েছে।

এর একটি হলো ভজনপুর (নিজবাড়ী)-আটোরখাড়ি-ময়নাগুড়ি-আমতলী-মিরগড়-পঞ্চগড় (জেড-৫০৬০) সড়কের ১৫তম কিলোমিটারে দ্বিতীয় করতোয়া সেতু নির্মাণ প্রকল্প।

অন্যটি হলো থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী।

জয়পুরহাটের খাল-নদী পুনঃখনন প্রকল্প অবহিত

সভায় পরিকল্পনামন্ত্রী কর্তৃক ইতোমধ্যে অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের ‘জয়পুরহাট জেলার নন্দাহার, হারাবতী নদী, নুনগোলা খাল এবং খাড়োয়া খাল পুনঃখনন’ প্রকল্প সম্পর্কে একনেককে অবহিত করা হয়।

এ প্রকল্পের মাধ্যমে জেলার সংশ্লিষ্ট নদী ও খালগুলোর পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত

একনেক সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন