বেনাপোল চেকপোস্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। যেকোনো সময় সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। চলমান কমিটিকে পাশ কাটিয়ে নতুন কমিটি গঠনের অভিযোগ তুলে সেটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও উপদেষ্টারা।
গতকাল বুধবার সকালে বেনাপোল চেকপোস্ট এলাকায় সংগঠনটির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দীন লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
কাউকে না জানিয়ে নতুন কমিটি গঠনের অভিযোগ
জসিম উদ্দীন বলেন, তিন বছরের মেয়াদে ‘বেনাপোল চেকপোস্ট ব্যবসায়ী সংগঠন’ নামে একটি ব্যবসায়ী সংগঠনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এতে দলমত নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যবসায়ীরা সম্পৃক্ত রয়েছেন।
তার অভিযোগ, সংগঠনের বর্তমান কমিটির কাউকে অবহিত না করে বেনাপোল পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের ভারত তার অনুসারী কয়েকজন নেতাকে নিয়ে হঠাৎ চেকপোস্ট এলাকায় উপস্থিত হন। পরে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের লোকজনকে নিয়ে পাল্টা ‘চেকপোস্ট ব্যবসায়ী সংগঠন’-এর একটি কমিটি গঠন করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ ঘটনায় অন্যান্য ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করেন জসিম উদ্দীন।
নতুন কমিটি নিয়ে নানা অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, নতুন করে গঠিত সংগঠনের কমিটিতে থাকা অধিকাংশ ব্যক্তি চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসায়ী ও হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নতুন কমিটির পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংগঠনের সভাপতি আজিজুল বলেন, প্রত্যেক ব্যবসায়ী সংগঠনের একটি গঠনতন্ত্র ও নির্দিষ্ট নিয়মনীতি থাকে। কিন্তু নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে এসব নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়নি।
তিনি অভিযোগ করেন, যারা এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন তারা এলাকায় বিভিন্ন কারণে বিতর্কিত দলবাজ নেতা হিসেবে পরিচিত। সংগঠনের কোনো কার্যক্রম বা কমিটি নিয়ে অভিযোগ থাকলে নিয়মতান্ত্রিকভাবে তা উত্থাপনের সুযোগ ছিল।
নিয়ম মেনে পরিবর্তনের প্রস্তাব
সভাপতি আজিজুল বলেন, সংগঠনের কমিটির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে উপদেষ্টা ও নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে বর্তমান দায়িত্বশীল নেতাদের ডেকে বিষয়টি জানানো যেত। প্রয়োজনে সভা ডেকে কমিটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও ছিল।
তিনি বলেন, সাধারণ ব্যবসায়ীরা যদি কমিটি পরিবর্তন চান, বৃহত্তর স্বার্থে বর্তমান দায়িত্বশীলরা দায়িত্ব হস্তান্তর করতে প্রস্তুত। তবে তা অবশ্যই সংগঠনের নিয়মনীতি মেনে করতে হবে।
দলীয় প্রভাব বিস্তার বা ব্যক্তিগত ক্ষমতা প্রয়োগ করে ব্যবসায়ী সংগঠনে কমিটি গঠন মেনে নেওয়া হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বৈধ প্রক্রিয়ায় কমিটি পরিবর্তনের দাবি
সংগঠনের সহসভাপতি সাংবাদিক আনিসুর রহমান, আলী আশরাফ ও উজ্জ্বল বিশ্বাস বলেন, কমিটিতে কোনো পরিবর্তন প্রয়োজন হলে তা বৈধ ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই করতে হবে। মনগড়াভাবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
তারা বলেন, ব্যবসায়ী সংগঠনের কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব বা ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে এর ফলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিভাজন বাড়বে এবং চেকপোস্ট এলাকায় স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হতে পারে।
উপদেষ্টাদের মতামত না নেওয়ার অভিযোগ
সংগঠনের উপদেষ্টা, সাদিপুর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ও ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক এবং সাধারণ সম্পাদক আব্দুস ছাত্তার বলেন, তারা সংগঠনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে তাদের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি।
তাদের অভিযোগ, এ ধরনের উদ্যোগের কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে মতভেদ ও সংঘর্ষের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাদের কাছে অভিযোগ জানানোর কথাও বলেন তারা।
ব্যবসায়ী ও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভাজনের আশঙ্কা
সংগঠনের আরেক উপদেষ্টা ও উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক এবং ব্যবসায়ী মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম এবং ছাত্রদলের সভাপতি শরিফুল ইসলাম চয়ন বলেন, তারাও সংগঠনটির উপদেষ্টা। চেকপোস্ট এলাকায় তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। অথচ নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে তাদের কিছুই জানানো হয়নি।
তারা বলেন, কোনো সংগঠনের নিয়মনীতি ও সংশ্লিষ্টদের মতামত উপেক্ষা করে কমিটি গঠন করা হলে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও মতবিরোধ তৈরি হতে পারে।
চেকপোস্টের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
চেকপোস্টের ব্যবসায়ী সবুজ হোসেন বলেন, চলমান কমিটির নেতাকর্মীরা চেকপোস্ট এলাকায় যাত্রী হয়রানি, ছিনতাই ও প্রতারণার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কাজ করতেন।
তার আশঙ্কা, নতুন করে মনগড়া কমিটি নিয়ে বিরোধ চলতে থাকলে চেকপোস্ট এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিঘ্নিত হতে পারে। ব্যবসায়ীদের স্বার্থে সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
নতুন কমিটি বাতিলের দাবি
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ব্যবসায়ী সংগঠনের কার্যক্রমে কোনো ধরনের রাজনৈতিক দলবাজি, ব্যক্তিগত প্রভাব বা ক্ষমতার প্রদর্শন কাম্য নয়। সংগঠনের গঠনতন্ত্র ও নিয়মনীতি অনুসরণ করেই কমিটি গঠন বা পরিবর্তন করতে হবে।
তারা হঠকারিতামূলক ও মনগড়া কমিটি বাতিল করে বিদ্যমান সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের দাবি জানান।
বক্তারা বলেন, চেকপোস্ট এলাকার ব্যবসায়িক পরিবেশ ও নিরাপত্তা স্বাভাবিক রাখতে দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। অন্যথায় চলমান উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে বেনাপোল চেকপোস্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের শতাধিক সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

