কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ব্রিজ নির্মাণের পরও সংযোগ সড়কের দুই পাশে মাটি না দেওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কয়েক গ্রামের মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে কাদা ও হাঁটুপানি পেরিয়ে চলাচলের পর সম্প্রতি ব্রিজের দুই পাশে মাটির পরিবর্তে বাঁশের চাটাই (চড়াট) বসানো হয়েছে। এতে সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হয়ে পথটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রায় ছয় ফুট খাড়া বাঁশের চাটাই বেয়ে ব্রিজে ওঠানামা করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীসহ পথচারীদের। এতে ভ্যান, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলসহ কোনো যানবাহনই স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছে না। ফলে ব্রিজটি নির্মাণের পরও এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয়রা।
ব্রিজ আছে, নেই স্বাভাবিক সংযোগ
রাজারহাট সদর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী নাটুয়ামহল এবং ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের চেতনা গ্রামের সীমান্ত এলাকায় ছিঁড়ারপাড় নামের একটি খালের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৩ মিটার দৈর্ঘ্যের ব্রিজটি।
ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘গ্রামীণ মাটির রাস্তায় সেতু/কালভার্ট নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্রিজটি নির্মাণের জন্য ২৯ লাখ ২৬ হাজার ২৮২ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের জুনে ব্রিজটির নির্মাণকাজ শুরু হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে ব্রিজটির নির্মাণকাজ চললেও সংযোগ সড়কের দুই পাশে প্রয়োজনীয় মাটি দেওয়া হয়নি। ফলে ব্রিজ নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও স্থানীয়রা সেটি স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করতে পারছিলেন না।
কাদা-পানি পেরিয়ে চলাচল
বর্ষাকালে ব্রিজের দুই পাশের সংযোগ সড়কে কাদা ও হাঁটুপানি জমে থাকায় পথচারীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে প্রায় ২ থেকে ৩ কিলোমিটার ঘুরে বিকল্প পথে যাতায়াত করেছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সরকারি অর্থ ব্যয়ে ব্রিজ নির্মাণ করা হলেও সংযোগ সড়কের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের অভিযোগ, ‘ত্রাণের কাজে যেন প্রাণ নেই—ব্রিজ হয়েছে, কিন্তু মানুষের স্বাভাবিক চলাচলের ব্যবস্থা হয়নি।’
সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে ব্রিজটির দুর্ভোগের বিষয়টি উঠে আসার পর সংযোগ সড়কের দুই পাশে মাটির পরিবর্তে বাঁশের চাটাই বসানো হয়। তবে এতে সমস্যার সমাধান না হয়ে যানবাহন চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বেশি
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন সাইকেল নিয়ে খাড়া বাঁশের চাটাই বেয়ে ব্রিজে ওঠানামা করতে গিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকতে হচ্ছে তাদের।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলো রানী বলেন, ‘সাইকেল নিয়ে বাঁশের চাটাই বেয়ে ওপরে উঠতে এবং নামতে আমাদের ভয় লাগে। অনেক সময় দুর্ঘটনায় পড়ে যাই।’
স্থানীয়রা জানান, ছোটখাটো ব্যবসায়ীরাও এ পথ এড়িয়ে চলছেন। এমনকি গুরুতর অসুস্থ রোগীদেরও বিকল্প পথে ঘুরিয়ে চিকিৎসার জন্য নিতে হচ্ছে।
৮ থেকে ১০ হাজার মানুষের ভোগান্তি
চেতনা গ্রামের নয়াবাড়ি এলাকার শরীফ উদ্দিনের ছেলে আবু হানিফ (৪৪) বলেন, ব্রিজের দুই পাশে মাটি না দেওয়ায় কিছুদিন আগেও স্কুলের শিক্ষার্থী ও হাটবাজারে যাতায়াতকারী মানুষকে হাঁটুপানি পেরিয়ে চলাচল করতে হয়েছে। অনেক বলাবলির পর মাটির পরিবর্তে বাঁশের চাটাই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতে অন্য কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারছে না।
নাটুয়াপাড়া গ্রামের আব্দুল আজিজ (৪৮) বলেন, চেতনা, নাটুয়া, পোদ্দারপাড়া, নয়াবাড়ি, শামকালিয়া ও রামপাড়া গ্রামের প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষ এই পথে যাতায়াত করেন। ব্রিজের সংযোগ সড়ক যথাসময়ে সম্পন্ন করা হলে স্থানীয়দের এ ভোগান্তিতে পড়তে হতো না।
রাজারহাট সদর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও নাটুয়ামহল গ্রামের বাসিন্দা মো. ইদ্রিস আলী বলেন, ব্রিজের দুই পাশে মাটি না দেওয়ায় মানুষের খুব ভোগান্তি হচ্ছে। দ্রুত সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান করা প্রয়োজন।
আগামী সপ্তাহে কাজ শুরুর আশ্বাস
এ বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, তিনি ঢাকায় প্রশিক্ষণে রয়েছেন। ঠিকাদারের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকে সংযোগ সড়কের কাজ শুরু করা হবে।
তিনি বলেন, স্থানীয়রা মাটি দিতে না দেওয়ায় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। ঠিকাদার সেখানে ভেকু নিয়ে গেলেও কাজ করতে দেওয়া হয়নি। এ কারণে কাজে বিলম্ব হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা হয়েছে এবং দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংযোগ সড়কের কাজ শেষ হলে স্থানীয়দের চলাচলের সমস্যা আর থাকবে না।

