ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে বুধবার ভোরে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত দুইজন নিহত হয়েছেন। নগরীর মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো এ তথ্য জানিয়েছেন। এর আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাজধানীতে বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করে বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শীত ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কিয়েভে রুশ হামলার মাত্রা বেড়েছে। সম্ভাব্য হামলার সতর্কবার্তা হিসেবে রাজধানীতে প্রায় সারাক্ষণই বিমান হামলার সাইরেন বাজছে।
বুধবার ভোরে কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় সামরিক বাহিনী সতর্কতা জারি করলে বাসিন্দারা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ভূগর্ভস্থ মেট্রো স্টেশনগুলোতে চলে যান। অনেকেই সঙ্গে করে ডাফেল ব্যাগ, ঘুমানোর মাদুর ও কম্বল নিয়ে মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নেন।
ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আগুন, নিহত ২
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো জানান, বুধবারের হামলায় রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ দারনিতস্কি এলাকায় একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেখানে আগুন নেভানোর সময় দুজনকে উদ্ধার করা হয় এবং পরে দুজনের মরদেহ পাওয়া যায়।
তিনি টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করার সময় দুজনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং নিহত দুই ব্যক্তির মরদেহও পাওয়া গেছে।
এদিকে কিয়েভে অবস্থানরত এএফপির এক সাংবাদিক বুধবার ভোরে পরপর কয়েকটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন বলে জানিয়েছেন।
মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় বাসিন্দাদের
হামলার আশঙ্কায় কিয়েভের বাসিন্দাদের অনেকেই রাতেই ভূগর্ভস্থ মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নেন। ব্যাংকে কর্মরত ইরিনা রিবালচেঙ্কো এএফপিকে বলেন, তারা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে মেট্রো স্টেশনে চলে এসেছেন এবং তাদের বাসা স্টেশনের কাছেই।
তিনি বলেন, পুরো কিয়েভ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। কর্মস্থলে থাকাকালীনও তাদের গ্রুপ চ্যাট এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সতর্ক থাকার জন্য বার্তা দিচ্ছিলেন।
৩৬ বছর বয়সী দারিয়া মেদভেদেভা বলেন, হামলার সময় শিশুরা অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ভারী গোলাবর্ষণ শুরু হলে তারা নিরাপত্তার জন্য ভূগর্ভস্থ স্থানে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
বড় হামলার প্রস্তুতির দাবি জেলেনস্কির
এর আগে রাতে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে—এ বিষয়ে ইউক্রেনের কাছে হালনাগাদ গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।
তিনি রাজধানীর বাসিন্দাদের বিমান হামলার সাইরেনের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে থেকে সম্ভাব্য হামলার জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
জেলেনস্কির ভাষণের পরপরই ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে পূর্বনির্ধারিত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার কার্যক্রম শুরু হয়। এর ফলে কিয়েভের বিভিন্ন এলাকা সাময়িকভাবে অন্ধকারে ডুবে যায়।
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কা
ইউক্রেনের বিমানবাহিনী সতর্ক করে জানায়, একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কিয়েভের দিকে এগিয়ে আসছে। একই সময়ে সামরিক পর্যবেক্ষণকারী কয়েকটি চ্যানেল বড় ধরনের রুশ হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করে।
তাদের ধারণা, সম্ভাব্য হামলায় ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি দ্রুতগতির জেটচালিত ড্রোন ব্যবহার করা হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো, রেল ও সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। দিনিপ্রো নদীর দুই তীরে বিস্তৃত কিয়েভকে সংযুক্তকারী গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলোও হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে।
সুমি ও জাপোরিঝিয়ায়ও হামলা
কিয়েভের বাইরে ইউক্রেনের অন্যান্য এলাকাতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। দেশটির জাতীয় পুলিশ জানিয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সুমি অঞ্চলে রুশ ড্রোন হামলায় দুইজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে ৭, ১৪ ও ১৬ বছর বয়সী তিন শিশুও রয়েছে। একটি অ্যাপার্টমেন্টে হামলার ঘটনায় তারা আহত হয়।
এদিকে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝিয়া অভিমুখে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, সেখানে হামলায় পরিবহন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যুদ্ধকালীন প্রস্তুতির আহ্বান
এর আগে কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো সতর্ক করে বলেছিলেন, রাজধানীকে এখন যুদ্ধকালীন প্রস্তুতির মধ্যে থাকতে হবে। সেতু ও জ্বালানি অবকাঠামোয় ধারাবাহিক হামলার কারণে কিয়েভের যোগাযোগ ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শীত ঘনিয়ে আসার সময়ে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে রাশিয়ার হামলা বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কার মধ্যেই রাজধানীসহ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বিমান হামলার সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে।

