আগামী বছর তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেছেন, তিস্তা প্রকল্পকে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই ও কারিগরি মূল্যায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে তিস্তা নদী গভীরভাবে সম্পৃক্ত। শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট এবং বর্ষাকালে নদীভাঙন ও বন্যা—দুই ধরনের চ্যালেঞ্জই তিস্তা অববাহিকার মানুষের মোকাবিলা করতে হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা ও কারিগরি দিক যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
আজ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘রিথিংকিং ওয়াটার ফিচারস: ইয়ুথ লিডারশীপ, জাস্টিস অ্যান্ড কোঅপারেশন’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পানিকে আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের পানির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পানি কূটনীতি, অববাহিকাভিত্তিক সহযোগিতা, জলবায়ু সহনশীলতা, অংশগ্রহণমূলক পানি ব্যবস্থাপনা এবং প্রজন্মগত ন্যায়বিচারকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় তরুণদের সম্পৃক্ত করা জরুরি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পানি ও টেকসই জলসম্পদ নিশ্চিত করতে যুবসমাজকে শুধু সুবিধাভোগী হিসেবে নয়, বরং নেতৃত্ব দেওয়ার মতো শক্তিতে পরিণত করতে হবে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক বদ্বীপ এবং নিম্ন অববাহিকার দেশ। দেশের সঙ্গে ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদী এসব দেশের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য কোনো বিকল্প নয়; বরং এটি অপরিহার্য।
তিনি বলেন, উজান ও ভাটির দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া আন্তঃসীমান্ত নদীর টেকসই ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়। নদীর পানির ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নদীর পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং নদীনির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তুলে ধরে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে একই সঙ্গে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও খরার মতো সমস্যা ক্রমেই পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানি ব্যবস্থাপনার প্রচলিত ধারণা দিয়ে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হবে। তাই অবকাঠামোগত উদ্যোগের পাশাপাশি পানি কূটনীতি ও আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তিস্তা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য তিস্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীটির পানি প্রবাহের মৌসুমি পরিবর্তনের কারণে একদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট তৈরি হয়, অন্যদিকে বর্ষায় অতিরিক্ত পানি বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়ায়। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও কারিগরি মূল্যায়নের কাজ চলছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়ন শেষে আগামী বছর তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সমস্যা সমন্বিতভাবে মোকাবিলার সুযোগ তৈরি হবে।
গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন পানিসম্পদমন্ত্রী। তিনি বলেন, গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনায় শুধু পানির পরিমাণ বিবেচনা করলে চলবে না। এর সঙ্গে পানি প্রবাহের সময়, প্রবাহের পরিবর্তনশীলতা, বন্যা ব্যবস্থাপনা, পলি পরিবহন, নদীর প্রতিবেশ এবং নদীনির্ভর মানুষের জীবিকা—সব বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, নদী কেবল পানির প্রবাহের মাধ্যম নয়; এর সঙ্গে একটি বিস্তৃত প্রতিবেশব্যবস্থা ও বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা জড়িত। তাই ভবিষ্যৎ পানি ব্যবস্থাপনায় নদীর সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র এবং মানুষের অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।
গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যথাসময়ে চুক্তিটি নবায়নের জন্য সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ যুক্ত করার বিষয়েও কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, অভিন্ন নদীগুলোর পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের জন্য পারস্পরিক আস্থা, তথ্য বিনিময় এবং যৌথ উদ্যোগ বাড়াতে হবে। শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো নদী অববাহিকাকে বিবেচনায় নিয়ে সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি শুধু জাতীয় নীতির অংশ নয়, এটি আঞ্চলিক সহযোগিতা ও জলবায়ু ন্যায়বিচারের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পানিসম্পদের ওপর বাড়তে থাকা চাপ মোকাবিলায় প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
সেমিনারে বক্তারা বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনায় তরুণদের সম্পৃক্ততা, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ব্যবস্থাপনা, পানি কূটনীতি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং পানি ব্যবহারে ন্যায়সংগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তারা বলেন, ভবিষ্যতে পানিকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে তরুণদের জ্ঞান, উদ্ভাবনী চিন্তা ও নেতৃত্বকে কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

