আসন্ন রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত ও ভোক্তাদের জন্য যৌক্তিক মূল্য বজায় রাখতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
তিনি বলেন, আমদানি ব্যয় কমাতে ফল ও খেজুরের শুল্ক যৌক্তিকীকরণ, ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ব্যাংকঋণের সুদহার কমানোর বিষয়ে আলোচনা এবং পণ্য খালাস ও পরিবহনের প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সারা বছর বাজার তদারকি অব্যাহত থাকবে।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের কনফারেন্স রুমে দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই) আয়োজিত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও বাজার স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণবিষয়ক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। পরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন মন্ত্রী।
রমজানের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ভোজ্যতেল, চিনি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ পাইপলাইনে রয়েছে। এসব পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলার কার্যক্রমও স্বাভাবিক রয়েছে। রমজানসহ সারা বছর সরবরাহব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে কাজ করা হচ্ছে।
আমদানি ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ফলের প্রকৃত শুল্কহার ১২১ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। খেজুরের শুল্ক কমানোর বিষয়েও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দেওয়া হয়েছে। ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ব্যাংকঋণের সুদহার কমানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
ফলের অস্বাভাবিক দাম প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুল্ক পরিশোধের পরও মাল্টা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও প্রশাসনের অভিযানের পর দাম অনেকটাই কমেছে। রমজান বা অন্য কোনো উপলক্ষকে কেন্দ্র করে কৃত্রিম সংকট তৈরি কিংবা অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের চেষ্টা বরদাশত করা হবে না। বাজার স্থিতিশীল রাখতে সারা বছরই তদারকি চলবে।
সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, দেশের লজিস্টিকস ব্যয় ১৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে আনার লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়ানো এবং পরিবহন ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমদানি, পণ্য খালাস ও পরিবহন প্রক্রিয়া সহজ করে সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করতে ট্রেড লাইসেন্স ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক করার কাজ চলছে বলেও জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। এর মাধ্যমে যেকোনো স্থান থেকে নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে লাইসেন্সের সনদ ডাউনলোড করা যাবে। পাশাপাশি সিঙ্গাপুরের আদলে যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরকে (আরজেএসসি) আধুনিকায়ন এবং ঘরে বসে মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ ও আঙুলের ছাপের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করে শেয়ার হস্তান্তরের ব্যবস্থা চালুর কাজ চলছে।
আমদানিকৃত শিল্প উপকরণের মান ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সোডিয়াম সালফেট বা সিনথেটিক লবণ এবং বিটুমিন আমদানিতে প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) বাধ্যতামূলক করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সরকার দীর্ঘদিন ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে ন্যূনতম মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়া ঠেকাতে অন্যান্য আমদানি পণ্যের শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন সমন্বয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০১৫ সালের পর দীর্ঘ ১১ বছর তাদের বেতন বাড়েনি। মূল্যস্ফীতির কারণে সৃষ্ট ক্রয়ক্ষমতার ঘাটতি সমন্বয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে এ ব্যবস্থা এখনো কার্যকর হয়নি এবং এক বছরে ধাপে ধাপে তা সমন্বয়ের কথা রয়েছে। ফলে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ার সুযোগ নেই।
সভায় ব্যবসায়ী নেতারা আসন্ন রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন। সিসিসিআই সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, রমজানে ডাল, ছোলা, গম, ভোজ্যতেল ও চিনিসহ প্রধান ভোগ্যপণ্যের কোনো কৃত্রিম সংকট হতে দেওয়া হবে না। বাজারের চাহিদা ও মজুদ নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে পণ্য খালাস নির্বিঘ্ন রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
চেম্বার সভাপতি চট্টগ্রামকে দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র ও আঞ্চলিক বাণিজ্য-লজিস্টিকসের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র উল্লেখ করে ব্যবসায়ীদের জন্য ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা ও ভোক্তাস্বার্থ রক্ষায় ব্যবসায়ীদের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন তিনি।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমির হুমায়ূন মাহমুদ চৌধুরী আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে এমন অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ তুলে দিয়ে জাতীয় আমদানি নীতি ও কাস্টমস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ করার আহ্বান জানান।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালাম বলেন, গত রমজানের মতো এবারও চাল, ডাল, ছোলা, গম, সয়াবিন ও পাম অয়েল এবং চিনির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীরা প্রস্তুত। কোনো পণ্যের ঘাটতি দেখা দিলে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি রমজানে সরবরাহব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখতে ব্যবসায়ীদের হয়রানি এড়িয়ে কাস্টমস, বন্দর ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানান।
সভায় চেম্বারের সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আলী আহমদ, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. আমজাদ হোসেন চৌধুরী, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এম এ সালাম, চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের কমিশনার আবুল বাসার মো. শফিকুর রহমান, সাবেক পরিচালক এস এম আবু তাইয়বসহ ব্যবসায়ী নেতারা বক্তব্য দেন।

