মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে: মাহদী আমিন

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, বৈশ্বিক নানা অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের সামনে নিশ্চয়তা, পরিকল্পনা ও সম্ভাবনা রয়েছে। সংকট ও চ্যালেঞ্জ থাকলেও সঠিক নীতি, পরিকল্পনা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জনগণের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গতকাল সোমবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে বে অব বেঙ্গল কনভার্সেশনের তৃতীয় দিনে ‘লিডার ইন অ্যান এইজ অব আনসার্টেইনিটি’ শীর্ষক সেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।

অনিশ্চয়তা মেনেই এগিয়ে যেতে হবে

মাহদী আমিন বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তা সব সময়ই থাকবে এবং সেটিকে স্বীকার করেই এগিয়ে যেতে হবে। চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া স্বাভাবিক ও অনিবার্য। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের আদর্শ, নীতিবোধ, পরিকল্পনা ও কর্মসূচিতে কতটা নিশ্চয়তা রয়েছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, সমাজ বা জাতীয় পর্যায়ে যখন কোনো সংকট দৃশ্যমান হয়, তা কার্যকরভাবে মোকাবিলার জন্য সরকারের প্রস্তুতি রয়েছে। পরিকল্পনা ও কর্মসূচির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং সম্ভাবনা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে তারা এমন একটি সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যারা দীর্ঘ সময় পর জনগণের বিপুল ও অকুণ্ঠ ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্বকারী গণতান্ত্রিক সরকার হিসেবে মানবাধিকার, আইনের শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাকে তারা দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন।

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন

ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রসঙ্গে মাহদী আমিন রোহিঙ্গা সংকটের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ সংকটের অনেক বিষয় বাংলাদেশের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকা এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা সম্ভব।

তার মতে, রোহিঙ্গা সংকটের সূত্রপাত যেহেতু মিয়ানমারে, তাই এর স্থায়ী সমাধানও মিয়ানমারেই নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। তারা যতদিন বাংলাদেশে অবস্থান করবে, ততদিন তাদের জন্য মানবিক জীবন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা ও অর্থায়ন অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

প্রযুক্তির পরিবর্তনে দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর

প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়েও বক্তব্য দেন মাহদী আমিন। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রযুক্তির কারণে কত কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হবে, তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। এ জন্য দেশের বিশাল জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি তরুণদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

মাহদী আমিন বলেন, তরুণ প্রজন্মকে ভবিষ্যতের কর্মবাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে শিক্ষাক্রম আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাঙ্গনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব জোরদার করা এবং কর্মসংস্থানের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিকল্পনা

জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিজনিত অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ ও প্রাকৃতিক পানির সংরক্ষণ বাড়াতে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খনন এবং পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া ঐতিহাসিক পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ এবং তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হিসেবে প্রয়োজনের সময় পানি সংরক্ষণ এবং কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কথা জানান তিনি।

সামাজিক সুরক্ষায় বিভিন্ন কার্ড চালুর পরিকল্পনা

ভবিষ্যতে বৈশ্বিক আর্থিক ধাক্কা বা অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিতে পারে উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, সঠিক নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব।

তিনি বলেন, নারীদের সুরক্ষা ও পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার কার্ড’ এবং দেশের নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ‘হেলথ কার্ড’ চালুর উদ্যোগ রয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব উদ্যোগের পাশাপাশি একটি সমন্বিত ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের নাগরিকদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।

১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা

মাহদী আমিন বলেন, সরকার ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশই নারী হওয়ার কথা রয়েছে।

তিনি বলেন, এর লক্ষ্য হলো দেশের প্রতিটি ঘরে এমন একজন স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা, যিনি মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারবেন।

জ্বালানি নিরাপত্তায় বহুমুখী উৎসের ওপর গুরুত্ব

জ্বালানি খাতের সংকট প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উত্তরাধিকার সূত্রে বেশ কিছু সংকট পেয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি খাত অন্যতম।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, সেটি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে ভবিষ্যৎ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সুরক্ষিত করা এবং জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে।

এ জন্য জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের ক্ষেত্রে বহুমুখী উৎসের দিকে যাওয়ার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সংকটকে জনগণের ক্ষমতায়নের সুযোগ হিসেবে দেখার কথা

মাহদী আমিন বলেন, চ্যালেঞ্জ সব সময়ই থাকবে। তবে প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে সরকার সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি জনগণের ক্ষমতায়নের একটি সুযোগ হিসেবে দেখতে চায়।

তিনি বলেন, প্রতিটি সংকটের সময়ে জনগণ কী চায়, তা শোনা এবং সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে ঘটানোই সরকারের লক্ষ্য।

বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি বলেন, মাত্র সাত মাস আগে দায়িত্ব নেওয়া নতুন নির্বাচিত সরকারের সামনে বিভিন্ন ধরনের সংকট ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে পরিকল্পিত নীতি, জনসম্পৃক্ততা এবং দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকার কাজ করছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন