শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ক্ষমতার ছায়ায় দখল, বদনাম সরকারের—ফুটপাত নিয়ে কঠোরতা কোথায়?

উচ্ছেদের পরই ফের দখল • পথচারী নামছেন সড়কে • নেপথ্যে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও প্রভাবশালী চক্রের অভিযোগ • শুধু উচ্ছেদ নয়, নিবন্ধন-পুনর্বাসন ও নিয়মিত নজরদারিতে স্থায়ী সমাধান

বিশেষ প্রতিবেদন

রাজধানীর ফুটপাত কার—পথচারীর, নাকি দখলদারের?

প্রশ্নটি নতুন নয়। বছরের পর বছর অভিযান হয়, দোকান সরানো হয়, জরিমানা করা হয়। কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পর একই জায়গায় আবার বসে দোকান। কোনো কোনো এলাকায় উচ্ছেদকারী দল সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময় পেছনে ফের দখলের ঘটনাও ঘটেছে। সাম্প্রতিক বড় অভিযানগুলোর পরও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত পুনর্দখলের ঘটনা ঘটছে।

তাহলে সমস্যাটা কোথায়?

হকারের জীবিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজনের জীবিকার অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে লাখো মানুষের নিরাপদ চলাচলের অধিকার কেড়ে নেওয়া সমাধান হতে পারে না। একইভাবে সব হকারকে ‘দখলদার’ বা ‘চাঁদাবাজ’ হিসেবে দেখা বাস্তবসম্মত নয়। বরং ফুটপাত ঘিরে হকারের জীবিকার সঙ্গে একটি অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, প্রভাবশালী মধ্যস্বত্বভোগী এবং চাঁদা আদায়ের অভিযোগ বহু বছর ধরে জড়িয়ে আছে।

আর এখানেই সামনে আসে কঠিন প্রশ্ন—ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে প্রশাসনের ধারাবাহিক কঠোরতা দেখা যায় না কেন?

ফুটপাত দখলের নেপথ্যে কী?

ঢাকায় ফুটপাত দখলের কারণ শুধু হকারের সংখ্যা বেশি হওয়া নয়। কর্মসংস্থানের ঘাটতি, স্বল্প পুঁজিতে ব্যবসার সুযোগ, বিকল্প জায়গার অভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা, পরিকল্পনার দুর্বল বাস্তবায়ন এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব—এসব কারণকে সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাটির পেছনে চিহ্নিত করেছেন।

এর সঙ্গে রয়েছে অর্থের প্রশ্ন।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে একাধিক অনুসন্ধান প্রকাশিত হয়েছে। যাত্রাবাড়ীতে হকারদের কাছ থেকে টাকা আদায় এবং এর সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালীসহ বিভিন্ন পক্ষের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে এসেছে। মিরপুর-১০ নিয়েও অতীতে বড় অঙ্কের চাঁদাবাজির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়েও মেট্রোরেল স্টেশনসংলগ্ন ফুটপাত দখলের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা ব্যক্তিদের অনুমতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় মানুষ ও হকারদের কেউ কেউ।

এসব অভিযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে—ফুটপাতের সমস্যা শুধু নগর ব্যবস্থাপনার নয়; এর সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িয়ে থাকতে পারে।

সরকার বদলায়, দখলের ব্যবস্থা কি বদলায়?

ফুটপাতের অবৈধ দখলকে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সমস্যা হিসেবে দেখলে মূল সংকট আড়ালে থেকে যেতে পারে।

অতীতে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির স্থানীয় নেতাকর্মী, প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা প্রশাসনের কারও কারও বিরুদ্ধে ফুটপাতকেন্দ্রিক অর্থ আদায়ে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তবে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া দায় আরোপ করা যায় না।

বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও যদি একই অবৈধ অর্থনীতি নতুন পৃষ্ঠপোষক খুঁজে নেয়, তাহলে সেই ব্যবস্থাটিই কেন ভাঙা যাচ্ছে না?

চাঁদাবাজির অর্থনীতি আদর্শনির্ভর নয়; যেখানে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সুরক্ষা পাওয়া যায়, সেখানেই তার টিকে থাকার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে কোনো সরকার যদি এমন গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেয়, অভিযোগের দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ভাবমূর্তিতেই এসে পড়ে।

ভোট হারানোর ভয়—নাকি জনস্বার্থের হিসাব?

হকারদের বড় একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে—এমন ধারণা রাজনীতিতে থাকা অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু এর বিপরীতে রয়েছেন প্রতিদিন ফুটপাত ব্যবহারকারী বিপুলসংখ্যক মানুষ—শিক্ষার্থী, নারী, শিশু, প্রবীণ, কর্মজীবী মানুষ এবং প্রতিবন্ধী নাগরিক।

ফুটপাত বন্ধ হলে তারা সড়কে নামতে বাধ্য হন। এতে শুধু ভোগান্তিই বাড়ে না, দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হয়। ফুটপাত দখলের কারণে পথচারীরা সড়কে নেমে যান—সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে এমন পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে।

তাই ফুটপাত দখলমুক্ত করলে ভোট বাড়বে না কমবে—এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিত বক্তব্য দেওয়া যায় না। তবে নাগরিকের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও নগর কর্তৃপক্ষের মৌলিক দায়িত্ব।

শুধু উচ্ছেদ কেন ব্যর্থ হয়

ঢাকায় বারবার দেখা গেছে, অভিযান চালিয়ে ফুটপাত পরিষ্কার করা হলেও কিছুদিন পর আবার দখল হয়ে যায়। এপ্রিলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বড় অভিযান চালানোর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই অনেক ফুটপাত পুনর্দখলের খবর পাওয়া যায়।

কারণ, দোকান তুলে দিলেই সমস্যার অর্থনৈতিক ভিত্তি শেষ হয় না।

হকার আবার জীবিকার জন্য ফিরে আসেন। তাঁর কাছ থেকে অর্থ আদায়কারী চক্র থাকলে তারাও ফিরে আসে। নিয়মিত নজরদারি না থাকলে আগের ব্যবস্থাই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

অর্থাৎ এক দিনের বুলডোজার দিয়ে বহু বছরের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি ভাঙা সম্ভব নয়।

সমাধান কোথায়?

সরকার ইতোমধ্যে ঢাকা সিটি হকার পুনর্বাসন নীতিমালা ২০২৬ জারি করেছে। এতে হকার নিবন্ধন, নির্ধারিত এলাকায় ব্যবসা এবং হলিডে ও নাইট মার্কেটের মতো ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও ছয়টি খোলা মাঠে অস্থায়ী মার্কেট করে নিবন্ধিত হকারদের সেখানে স্থানান্তরের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।

তবে নীতিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—সড়ক বা ফুটপাতে হকারদের জায়গা বরাদ্দের বৈধতা—হাইকোর্টে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এ বিষয়ে আদালত রুলও দিয়েছেন।

তাই স্থায়ী সমাধানের জন্য কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত করা প্রয়োজন—

প্রথমত, প্রধান সড়ক, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মেট্রোরেল স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড ও ব্যস্ত মোড়ের পথচারী চলাচলের অংশকে কার্যকরভাবে দখলমুক্ত রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, প্রকৃত হকারদের ডিজিটাল নিবন্ধন করতে হবে। একজনের নামে একাধিক জায়গা কিংবা রাজনৈতিক সুপারিশে জায়গা পাওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।

তৃতীয়ত, হকারদের জন্য বৈধ বিকল্প স্থান, নাইট মার্কেট ও হলিডে মার্কেট তৈরি করতে হবে। নির্ধারিত সরকারি ফি ছাড়া কোনো নগদ অর্থ আদায়ের সুযোগ রাখা যাবে না।

চতুর্থত, ফুটপাত থেকে কে টাকা তোলে—সেটিকে আলাদা আইনশৃঙ্খলা ইস্যু হিসেবে দেখতে হবে। অভিযোগ পেলে অর্থের প্রবাহ অনুসরণ করে মধ্যস্বত্বভোগী ও পৃষ্ঠপোষককে আইনের আওতায় আনতে হবে।

পঞ্চমত, এককালীন উচ্ছেদের পরিবর্তে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত নজরদারি এবং পুনর্দখলের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা প্রয়োজন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও সম্প্রতি নিয়মিত নজরদারি ও আকস্মিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।

ফুটপাত আসলে কার?

ফুটপাত কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। হকারেরও নয়। এটি মূলত মানুষের নিরাপদ চলাচলের অবকাঠামো।

একই সঙ্গে হকাররাও এই শহরের নাগরিক। তাঁদের জীবিকা ধ্বংস করা নয়—শৃঙ্খলার মধ্যে এনে পুনর্বাসনই হতে পারে টেকসই পথ।

কিন্তু জীবিকার যুক্তিকে ব্যবহার করে যদি ফুটপাতের জায়গা কেনাবেচা হয়, অবৈধ অর্থ আদায় হয় কিংবা কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী জনসাধারণের জায়গা নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে সেটি আর হকার পুনর্বাসনের প্রশ্ন থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে আইনের শাসন ও নগর ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন।

একদিকে হকারের জীবিকা, অন্যদিকে পথচারীর অধিকার—রাষ্ট্রকে দুটিই রক্ষা করতে হবে। কিন্তু চাঁদাবাজি বা অবৈধ দখলের সঙ্গে আপস করে কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা করা সম্ভব নয়।

ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে তাই শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, প্রয়োজন স্বচ্ছ হকার ব্যবস্থাপনা, কার্যকর পুনর্বাসন, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে তদন্ত এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে একই আইনের প্রয়োগ।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন