মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আদানি বিদ্যুৎ চুক্তি: ৪০ কোটি ডলারের শুল্ক-কর ফাঁকির তথ্য এনবিআরের

ভারতের আদানি পাওয়ার লিমিটেডের কাছ থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে প্রায় ৪০ কোটি মার্কিন ডলারের শুল্ক-কর ফাঁকির তথ্য পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। সংস্থাটির তদন্তে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই শুল্ক ও কর অব্যাহতি দেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

এদিকে, আদানি পাওয়ার লিমিটেড ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক মুখ্যসচিব এবং তৎকালীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের বিরুদ্ধে চলমান অবৈধ সম্পদ অর্জনের অনুসন্ধানের সঙ্গে আদানি চুক্তির অনিয়মের বিষয়টি যুক্ত করার সুপারিশ করেছে কমিশন।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ড. আহমদ কায়কাউসের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে ‘আদানি পাওয়ার লিমিটেড ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ’ যুক্ত করে অনুসন্ধানের সুপারিশ করেছে কমিশন।

দুদকের এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে আলোচিত আদানি বিদ্যুৎ চুক্তির আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের বিষয়টি নতুন করে অনুসন্ধানের আওতায় আসছে। বিশেষ করে চুক্তি সম্পাদনের সময় সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা, শুল্ক ও কর অব্যাহতির সিদ্ধান্ত এবং এতে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এনবিআরের তদন্তে ৪০ কোটি ডলারের শুল্ক-কর

আদানি থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে শুল্ক ও কর পরিশোধ না করার অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করে এনবিআরের কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। সংস্থাটির আট সদস্যের একটি তদন্ত দল চুক্তির শুল্কসংক্রান্ত বিষয়গুলো কীভাবে সম্পাদন করা হয়েছে, এতে কোনো ত্রুটি ছিল কি না এবং আইন অনুযায়ী শুল্ক পরিহার বা প্রত্যাহারের সুযোগ ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই পর্যন্ত ভারতের আদানি গ্রুপের কাছ থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের বিপরীতে ৩৯ কোটি ৭৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৬৭ মার্কিন ডলারের শুল্ক-কর ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা।

এনবিআরের কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তদন্তে আরও উঠে এসেছে, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ প্রবেশ ও সঞ্চালনের ক্ষেত্রে আমদানির যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিলের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে বিষয়টি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি না করার তথ্যও পাওয়া গেছে।

এসব তথ্যের ভিত্তিতে ফাঁকি দেওয়া শুল্ক-কর বাবদ বিপুল অর্থ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কাছ থেকে আদায়ের সুপারিশ করেছে এনবিআরের তদন্ত কমিটি।

অনুমোদন ছাড়াই শুল্ক-কর অব্যাহতির অভিযোগ

আদানি থেকে বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে শুল্ক ও কর অব্যাহতির বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পেয়েছে। এনবিআরের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় আদানি থেকে বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে পিডিবি শুল্ক ও কর অব্যাহতি দিয়েছে। তবে এ ধরনের অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষেত্রে এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

ফলে চুক্তির আওতায় বিদ্যুৎ আমদানির সময় শুল্ক-কর অব্যাহতির সিদ্ধান্ত কতটা আইনসম্মত ছিল এবং এর ফলে রাষ্ট্রের রাজস্বে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এর আগে গত বছরের ৩০ এপ্রিল আদানি গ্রুপের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে এনবিআরকে পাশ কাটিয়ে শুল্ক ও কর অব্যাহতির মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। ওই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তৎকালীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সচিব আহমদ কায়কাউসের নেতৃত্বাধীন কর্তৃপক্ষ এবং পিডিবির বিভিন্ন নথিপত্রও তলব করা হয়।

২০২৩ সালে শুরু বিদ্যুৎ আমদানি

ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডায় স্থাপিত আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হয় ২০২৩ সালের ৯ মার্চ। এরপর থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের বিপরীতে শুল্কসহ অন্যান্য কর পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

এনবিআরের তদন্তে আমদানি প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা, বিল অব এন্ট্রি দাখিল এবং শুল্ক-কর অব্যাহতির আইনি ভিত্তি নিয়ে অসঙ্গতির তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্ত প্রতিবেদনের এসব তথ্যের ভিত্তিতেই বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, দুদক আদানি চুক্তির অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগকে ড. আহমদ কায়কাউসের বিরুদ্ধে চলমান অবৈধ সম্পদ অর্জনের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করার সুপারিশ করেছে। ফলে এখন চুক্তি সম্পাদন থেকে শুরু করে শুল্ক-কর অব্যাহতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা—সবকিছুই দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় আসতে পারে।

আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়ে থাকলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় এবং রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করাই এখন দুদকের অনুসন্ধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন