মাথায় আঘাতকে অনেক সময় সাধারণ সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও এর প্রভাব গুরুতর হতে পারে। মস্তিষ্ক করোটির ভেতরে সুরক্ষিত থাকলেও তীব্র আঘাতে মস্তিষ্কের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, মাথার ভেতরে রক্তক্ষরণ বা ফুলে যাওয়ার মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই মাথায় উল্লেখযোগ্য আঘাতের পর উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
মস্তিষ্ক শরীরের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। দেখা, শোনা, কথা বলা, স্মৃতি, অনুভূতি, চিন্তা, বিচারবোধ, শরীরের নড়াচড়া ও বিভিন্ন শারীরিক কার্যক্রমের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। মস্তিষ্ক করোটির পাশাপাশি মেনিনজেস নামের আবরণ এবং সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইডের মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকে। তবে শক্তিশালী আঘাতে এই সুরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মাথায় আঘাতের মাত্রা ও ধরন অনুযায়ী এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে। হালকা আঘাতে সাময়িক মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা বা বিভ্রান্তির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। আবার গুরুতর আঘাতে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, মস্তিষ্ক ফুলে যাওয়া বা দীর্ঘস্থায়ী স্নায়বিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তীব্র আঘাতের পর কিছু ক্ষেত্রে স্মৃতিশক্তিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। আহত ব্যক্তি সাময়িকভাবে ঘটনাটি মনে রাখতে না-ও পারেন। গুরুতর ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় অচেতন থাকা বা শরীরের কোনো অংশের নড়াচড়ায় সমস্যা হতে পারে।
মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে কথা বলা বা ভাষা বোঝার ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ধরনের অবস্থাকে অ্যাফেসিয়া বলা হয়। এর ফলে ব্যক্তি কথা বলতে, সঠিক শব্দ খুঁজে পেতে বা অন্যের কথা বুঝতে সমস্যায় পড়তে পারেন।
কোন লক্ষণগুলো বিপজ্জনক
মাথায় আঘাতের পর নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন—
- বারবার বমি হওয়া
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা জ্ঞান হারানোর পর স্বাভাবিকভাবে না ফেরা
- অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব বা জাগিয়ে রাখা কঠিন হওয়া
- তীব্র বা ক্রমেই বাড়তে থাকা মাথাব্যথা
- খিঁচুনি হওয়া
- কথা বলতে বা বুঝতে সমস্যা হওয়া
- হাত-পা দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া
- হাঁটা বা শরীরের ভারসাম্য রাখতে সমস্যা
- আচরণ বা মানসিক অবস্থায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন
- চোখের মণির আকারে অস্বাভাবিকতা বা দৃষ্টিতে সমস্যা
- কান বা নাক দিয়ে রক্ত কিংবা স্বচ্ছ তরল বের হওয়া
বিশেষ করে দুর্ঘটনা, উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়া বা শক্ত কোনো বস্তুর আঘাতের পর এসব লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নেওয়া উচিত।
মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া ব্যক্তিকে অপ্রয়োজনে নড়াচড়া করানো উচিত নয়। কারণ মাথার আঘাতের সঙ্গে ঘাড় বা মেরুদণ্ডেও আঘাত থাকতে পারে। আহত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস ও সচেতনতার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে।
আঘাতের পর ব্যক্তি স্বাভাবিক মনে হলেও কিছু ক্ষেত্রে পরে উপসর্গ প্রকাশ পেতে পারে। তাই উল্লেখযোগ্য মাথায় আঘাতের পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পর্যবেক্ষণে থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
মাথায় আঘাতের পর শুধু বাহ্যিক ক্ষত বা রক্তপাত না থাকাকে নিরাপদ হওয়ার লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। মাথার ভেতরে রক্তক্ষরণ বা অন্য কোনো জটিলতা বাইরে থেকে বোঝা নাও যেতে পারে।
মস্তিষ্কে আঘাতের পর দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা নির্ভর করে আঘাতের ধরন, মাত্রা ও মস্তিষ্কের কোন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার ওপর। তাই মাথায় গুরুতর আঘাতকে কখনোই অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের মূল্যায়ন নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।

