বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

তেল আমদানিতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ব্যয় বাংলাদেশের, এক বছরেই দ্বিগুণের বেশি

১০.৬৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল জ্বালানি আমদানি ব্যয়; পরিশোধিত তেলেই গেছে ৯.৪৪ বিলিয়ন ডলার—ডলার, রিজার্ভ ও মূল্যস্ফীতিতে বাড়ছে চাপ

বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ইতিহাসে নতুন রেকর্ড হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০.৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৫.১৪ বিলিয়ন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে তা প্রায় ১০.৬৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলার। বৃদ্ধির হার প্রায় ১০৭ শতাংশ।

এত বড় অঙ্কের জ্বালানি আমদানি ব্যয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা, উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরির ঝুঁকি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতি বাংলাদেশের অর্থনীতির সংবেদনশীলতাও সামনে এসেছে।

এক বছরে কোথা থেকে কোথায়

২০২৫-২৬ অর্থবছরে অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১.২০ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের তুলনায় এ খাতে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৯২ শতাংশ।

তবে সবচেয়ে বড় চাপ এসেছে পরিশোধিত petroleum, oil and lubricants বা POL থেকে। এ খাতে ব্যয় প্রায় ৯.৪৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০৯ শতাংশ বেশি।

অর্থাৎ বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের সিংহভাগই এখন পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের পেছনে যাচ্ছে।

শুধু দাম নয়, বেড়েছে আমদানির পরিমাণও

ব্যয় বৃদ্ধির পুরোটা আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে হয়নি। আমদানির পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ—প্রথম নয় মাসে বাংলাদেশ প্রায় ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টন জ্বালানি আমদানি করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ লাখ ৫ হাজার টন। অর্থাৎ নয় মাসে পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১৩.৭ শতাংশ।

একই সময়ে আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি ছিল আরও দ্রুত। ওই নয় মাসে আমদানি মূল্যের সঙ্গে শুল্ক-কর মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৫৩ হাজার ৪২০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল প্রায় ৪১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা।

আমদানির তালিকায় রয়েছে ডিজেল, অপরিশোধিত তেল, ফার্নেস অয়েল, পেট্রোল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও বেস অয়েল।

ডিজেলের চাহিদাই বড়

বাংলাদেশের পরিবহন, কৃষি, শিল্প এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি অংশ সরাসরি জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির চাহিদাও বাড়ছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (BPC) প্রায় ২৬ লাখ ৮৭ হাজার টন ডিজেল, ১৬ লাখ ২ হাজার টন অপরিশোধিত তেল এবং ১১ লাখ ২৬ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আমদানি করেছে বলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

BPC-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট জ্বালানি তেলের চাহিদা ছিল প্রায় ৭৪ লাখ টন।

এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট প্রায় ৬২ লাখ ১৫ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছিল। এর প্রায় ২৪ শতাংশ ছিল অপরিশোধিত এবং ৭৬ শতাংশ ছিল পরিশোধিত তেল।

যুদ্ধ ও বিশ্ববাজারের অস্থিরতায় বাড়তি চাপ

জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতাও যুক্ত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ে।

CPD-এর জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, দেশের জ্বালানি চাহিদা এমনিতেই প্রতিবছর বাড়ছে; এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা যুক্ত হওয়ায় আমদানি ব্যয় আরও বেড়েছে। CPD-তে প্রকাশিত তাঁর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে ভবিষ্যৎ চাপ সামাল দিতে আগেভাগে কৌশলগত প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে ব্যয় বৃদ্ধিকে শুধু সাম্প্রতিক যুদ্ধের ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার আগেই ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে জ্বালানি আমদানি ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫২ শতাংশ বেড়েছিল।

প্রতি সাত ডলারের প্রায় এক ডলার জ্বালানিতে

রেকর্ড ব্যয়ের আকার বুঝতে দেশের মোট আমদানির সঙ্গে তুলনাটি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট পণ্য আমদানির বিপরীতে জ্বালানি আমদানির অংশ ছিল প্রায় ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ আমদানিতে ব্যয় হওয়া প্রতি সাত ডলারের প্রায় এক ডলার গেছে জ্বালানির পেছনে।

এখানেই অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। কারণ জ্বালানি এমন একটি আমদানি পণ্য, যার মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে সীমাবদ্ধ থাকে না।

ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়লে পরিবহন, কৃষি সেচ, শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়তে পারে। সেই অতিরিক্ত ব্যয় পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন খরচের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরও পড়তে পারে।

ডলার ও রিজার্ভে চাপের ঝুঁকি

১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি জ্বালানি আমদানির অর্থ হচ্ছে শুধু এ খাতেই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন হচ্ছে।

CPD-এর বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের বিশ্লেষণেও উচ্চ জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের কারণে ভবিষ্যতে ডলার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বৃদ্ধির ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে।

তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য বাড়লে একই পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করতেও বেশি ডলার প্রয়োজন হয়। আবার একই সময়ে আমদানির পরিমাণও বাড়লে চাপটি দ্বিমুখী হয়ে ওঠে।

চলতি অর্থবছরের শুরুতেও চাপ কমেনি

উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রেকর্ডের পরও নতুন অর্থবছরের শুরুতে জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমার স্পষ্ট লক্ষণ নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মাসভিত্তিক আমদানি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাইয়ে petroleum goods আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১.৩৭৫ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের জুলাইয়ে একই খাতে ব্যয় ছিল ৭৫০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জুলাইয়ের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৮৩ শতাংশ।

এর মধ্যে POL আমদানি ব্যয় ৬৮৪.৪ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ১.৩৪৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, বৃদ্ধি প্রায় ৯৬.৭ শতাংশ।

এটি দেখাচ্ছে, আগের অর্থবছরের রেকর্ড ব্যয়কে কেবল এক বছরের ব্যতিক্রম হিসেবে দেখার সুযোগ এখনই নেই।

সামনে বড় প্রশ্ন—আমদানিনির্ভরতা কতটা কমবে?

বাংলাদেশের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ শুধু কম দামে জ্বালানি কেনা নয়। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুত, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, পরিশোধন সক্ষমতা এবং বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের দাম বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ভূরাজনৈতিক সংঘাত কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথে বিঘ্ন ঘটলেও দেশের নিয়ন্ত্রণ সীমিত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হলে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে তার অভিঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১০.৬৩ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড জ্বালানি বিল তাই শুধু একটি আমদানি পরিসংখ্যান নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (BPC), চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস, CPD এবং সংশ্লিষ্ট প্রকাশিত অর্থনৈতিক তথ্য।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন