বরগুনার বেতাগীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের হয়রানি এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। একটি সংঘবদ্ধ চক্র ফেসবুক, মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলে স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল অভিযোগ করেছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে উপজেলায় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধও বেড়েছে। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে তাদের সাধারণ ছবি সংগ্রহের পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অপব্যবহার করে বিকৃত ছবি বা ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরে এসব ছবি-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছে অর্থ দাবি করা হচ্ছে। মান-সম্মানের কথা চিন্তা করে অনেকে বিষয়টি প্রকাশ না করে দাবিকৃত টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একাধিক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, ফেসবুকের কিছু ভুঁইফোড় পেজ থেকে তাদের ছবি সংগ্রহ করে অনুমতি ছাড়াই প্রকাশ করা হচ্ছে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কখনো কখনো হুমকি অনুযায়ী ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করায় ভুক্তভোগীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন।
বেতাগী সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসরাত বলেন, তারা ভাই-বোন কোথাও ঘুরতে গেলে অনেক সময় গোপনে ছবি ধারণ করে সেগুলো বিভিন্ন অ্যাপ ও পেজে প্রকাশ করা হচ্ছে। অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ হলে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয় বলেও জানান তিনি।
একই কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. নবীন বলেন, বিভিন্ন পেজে মানুষের অজান্তে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি অনেকেই হয়রানি ও বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন।
একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোসা. সিলবি বলেন, রাস্তাঘাট বা বিভিন্ন স্থানে অবস্থানের সময় গোপনে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে তারা বিব্রত ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী মেহেদী বলেন, ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে বলে তারা শুনেছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীরা এ ধরনের হয়রানি থেকে মুক্তি চান।
দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফিজা বলেন, ব্যক্তিগত বিষয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা অত্যন্ত বিব্রতকর। অনুমতি ছাড়া কারও ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য ব্যবহার বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে আইনজীবীরা বলেন, কারও অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ধারণ, সংরক্ষণ কিংবা অনলাইনে প্রকাশের ঘটনায় প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তারা ভুক্তভোগীদের ভয় না পেয়ে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করার পরামর্শ দেন।
বেতাগী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হারুন অর রশীদ হাওলাদার বলেন, কয়েকটি পেজের নাম তারা একাধিকবার মৌখিকভাবে পেয়েছেন। এসব পেজে ছেলে-মেয়েদের ব্যক্তিগত ও আপত্তিকর ছবি প্রকাশের অভিযোগ রয়েছে। বিষয়গুলো পুলিশের নজরে রয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের শনাক্তে পুলিশ কাজ করছে।
তিনি বলেন, কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করে হয়রানি বা সম্মানহানি করা হলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, ফোন নম্বর বা পাসওয়ার্ড অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে শেয়ার না করার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত সচেতন করতে হবে।
কেউ অনলাইনে হয়রানি বা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলে বিষয়টি গোপন না রেখে অভিভাবক, শিক্ষক বা প্রশাসনকে জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং ও মেন্টরিং জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
তাদের মতে, কোনো শিক্ষার্থী হঠাৎ চুপচাপ বা বিষণ্ন হয়ে পড়লে তার সঙ্গে কথা বলে অনলাইনে হয়রানির শিকার হয়েছে কি না, তা জানার চেষ্টা করা প্রয়োজন। নিয়মিত ক্লাস, সমাবেশ বা অন্যান্য কার্যক্রমে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক আলোচনা করা হলে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাদ্দাম হোসেন বলেন, বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি সাইবার অপরাধসংক্রান্ত একাধিক অভিযোগ শুনেছেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে বিশেষভাবে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বেতাগীতে কেউ সাইবার অপরাধের শিকার হলে তাকে আইনি সহায়তা দিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল সাইবার অপরাধ ও ব্ল্যাকমেইলের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সাইবার সচেতনতা কার্যক্রম জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।

