২৪ সেপ্টেম্বর প্রথমবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী; জলবায়ু, রোহিঙ্গা সংকট, গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরার কথা
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পর জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে তাঁর প্রথম ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
বাসস জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন। ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটিই হবে জাতিসংঘের এই গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে তাঁর প্রথম ভাষণ।
এর মধ্য দিয়ে একই পরিবারের তিন সদস্যের বাংলাদেশের সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হচ্ছে।
শুরুটা জিয়াউর রহমানের
তারেক রহমানের বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে বক্তব্য দেন।

সেই ভাষণে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, ক্ষুধা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছিল। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের বিপুল জনগোষ্ঠী কেন দারিদ্র্য ও ক্ষুধা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না—সে প্রশ্নও তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেছিলেন।
একই সঙ্গে শান্তি, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
১৩ বছর পর একই মঞ্চে খালেদা জিয়া
জিয়াউর রহমানের ভাষণের ১৩ বছর পর ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে প্রথমবার বক্তব্য দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

এরপর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকেন্দ্রিক আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে তিনি অংশ নেন। এর মধ্যে ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মারক সভা, ২০০২ সালে শিশুবিষয়ক ২৭তম বিশেষ অধিবেশন এবং ২০০৫ সালে ৬০তম অধিবেশনের বিভিন্ন সভা রয়েছে।
বাসসের প্রতিবেদনে জাতিসংঘের নথির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে খালেদা জিয়া মোট পাঁচবার সাধারণ পরিষদের কার্যক্রমে বক্তব্য দিয়েছিলেন।
এবার তারেক রহমান
চার দশকেরও বেশি সময় পর এবার জিয়া পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের সদস্য হিসেবে একই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভাষণে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক রূপান্তর, বৈশ্বিক শান্তি, আন্তর্জাতিক সংকটের টেকসই সমাধান, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়ার কথা রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান এবং জলবায়ু অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তাও বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
রোহিঙ্গা সংকটও বাংলাদেশের এবারের জাতিসংঘ কূটনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে থাকছে। সংকটের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে নতুন করে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য বাড়তি তাৎপর্য
এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের জন্য আরেকটি কারণে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের ড. খলিলুর রহমান। জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটেও তাঁকে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—‘Restoring trust, managing transformation: A United Nations that delivers for all’। জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক সূচি অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক নিউইয়র্কে ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হবে। ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর টানা পাঁচ দিন এবং বিরতির পর ২৮ সেপ্টেম্বর আবার সাধারণ বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে।
বিশ্বের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা এ পর্বে নিজ নিজ দেশের অবস্থান ও বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকট নিয়ে বক্তব্য দেবেন।
১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান, ১৯৯৩ সালে খালেদা জিয়া—আর এবার ২০২৬ সালে তারেক রহমান। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত ভাষণের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্ম নয়, বরং একই পরিবারের তিন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অংশগ্রহণের একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা তৈরি হতে যাচ্ছে।

