ফরিদপুরের সড়ক-মহাসড়কে থামছে না দুর্ঘটনা। প্রায় প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন সড়কে ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, অবৈধ যানবাহনের চলাচল, চালকের অসাবধানতা ও ক্লান্তি, ধীরগতির যানবাহনের সঙ্গে দ্রুতগতির যান চলাচল এবং পথচারীদের অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৯ মাসে ফরিদপুরের বিভিন্ন মহাসড়কে ৭৪৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৭৯ জন। আহত হয়েছেন আরও ১ হাজার ২৩১ জন। দুর্ঘটনাগুলোর ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩৭১টি।
এর মধ্যে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ২২৭টি দুর্ঘটনায় ১৯১ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৬০ জন পুরুষ, ২৪ জন নারী ও সাতজন শিশু। এ সময়ে আহত হয়েছেন ৩৯৩ জন এবং দুর্ঘটনাগুলোর ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৪৯টি।
জেলার দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোর মধ্যে ভাঙ্গা অন্যতম বলে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণবঙ্গমুখী মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। একই সঙ্গে মহাসড়কে নসিমন, করিমন, ভটভটি, ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশার মতো ধীরগতির যানবাহনের চলাচল এবং দ্রুতগতির যানবাহনের বেপরোয়া গতি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
ভাঙ্গা সদরের বাসিন্দা মো. আব্দুল মান্নান মাতুব্বর বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর ভাঙ্গা এলাকায় সড়ক প্রশস্ত করা হলেও কয়েকটি ব্রিজ এখনো তুলনামূলক সরু। এসব ব্রিজ দিয়ে দ্রুতগতির যানবাহন চলাচলের সময় দুর্ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি হাইওয়ে ও এক্সপ্রেসওয়েতে নিয়ম না মেনে দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালানোর কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে।
পরিবহন চালক আজাহার শেখ বলেন, সড়কের বিভিন্ন ত্রুটি এবং দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ি চালানোর কারণে চালকেরা অনেক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এর সঙ্গে ছোট যানবাহনের এলোমেলো ও বেপরোয়া চলাচল যুক্ত হলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
আরেক বাসচালক আফছার উদ্দিন বলেন, অনেক সময় পথচারীরা যানবাহনের গতিবিধি না দেখে মহাসড়ক পার হওয়ার চেষ্টা করেন। ছোট যানবাহনের চালকেরাও অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম না মেনে চলাচল করেন। দুর্ঘটনা ঘটলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শুধু চালককে দায়ী করা হয়।
ফরিদপুর জজকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সেলিমুজ্জামান রুকু বলেন, মহাসড়কে দুর্ঘটনার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকের অসাবধানতা ও ক্লান্তি, অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এবং ধীরগতির ও ছোট যানবাহনের অবাধ চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি পথচারীদের অসচেতনতা, যত্রতত্র রাস্তা পারাপার এবং মহাসড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা ও হাটবাজারও দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী শিপ্রা গোস্বামী বলেন, দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর পর চালকের মনোযোগ কমে যেতে পারে। চালকের ক্লান্তি বা অসুস্থতার কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনাও ঘটতে পারে।
ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা বলেন, চালকের অসাবধানতা, অদক্ষতা, লাইসেন্সবিহীন চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়কের স্বল্পতা ও অপ্রশস্ততা, পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এর সঙ্গে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং একই সড়কে দ্রুত ও ধীরগতির যানবাহন চলাচলও দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে।
তিনি বলেন, যাত্রী ও পথচারীদের অসচেতনতার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের পর্যাপ্ত নজরদারির ঘাটতিও দুর্ঘটনা প্রতিরোধের পথে বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্ঘটনা কমাতে দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর তদারকি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
ফরিদপুর জেলা বাস মালিক সমিতির নেতা মো. মুরাদ হোসেন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালকদের দায়ী করলে সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান হবে না। যাত্রী ও পথচারীদেরও সচেতন হতে হবে। মহাসড়কের পাশে দোকানপাট, স্কুল বা জনবসতি থাকলে শিশু ও বয়স্করা অনেক সময় অসতর্কভাবে রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি নসিমন-করিমনসহ ধীরগতির যানবাহনের চালকদেরও মহাসড়কে চলাচলের নিয়ম মেনে চলতে হবে।
মাদারীপুর রিজিয়নের হাইওয়ে পুলিশের ফরিদপুর কার্যালয়ের পুলিশ সুপার মোমতাজুল এহসান আহমেদ হুমায়ুন বলেন, মহাসড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন ধরনের যানবাহন হাইওয়ে পুলিশের নজরদারির মধ্যে রয়েছে। বেপরোয়া বা আইন অমান্য করে চলাচলকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, জনবল সংকট থাকলেও মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশ ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে। বেপরোয়া যানবাহন ও আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্ঘটনা কমাতে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সড়কের ত্রুটি দূর করা, ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ ও পয়েন্ট চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া, অবৈধ যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, চালকদের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত এবং যাত্রী-পথচারীদের সচেতনতা বাড়ানোর ওপর সমন্বিতভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।

