শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা নজরদারির প্রস্তাবে রাশিয়া-চীনের ভেটো

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব আটকে গেল • পক্ষে ১১ দেশ, বিরত পাকিস্তান ও সোমালিয়া • স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেলের কার্যক্রমের পথ বন্ধ • পশ্চিমাদের ‘বিপজ্জনক পদক্ষেপ’ বন্ধের আহ্বান মস্কোর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানের ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা বহাল রাখার উদ্যোগ আটকে দিয়েছে রাশিয়া ও চীন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের আনা একটি খসড়া প্রস্তাবে দুই স্থায়ী সদস্য ভেটো দেওয়ায় নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেলের ম্যান্ডেট আর কার্যকর থাকছে না।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) নিরাপত্তা পরিষদের ভোটাভুটিতে ১৫ সদস্যের মধ্যে ১১টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। রাশিয়া ও চীন বিপক্ষে ভোট দিয়ে ভেটো প্রয়োগ করে। পাকিস্তান ও সোমালিয়া ভোটদানে বিরত থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবটির উদ্দেশ্য ছিল ইরানের বিরুদ্ধে পুনর্বহাল হওয়া জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হচ্ছে এবং কোথাও তা লঙ্ঘিত হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ ও নিরাপত্তা পরিষদকে প্রতিবেদন দেওয়ার ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা।

কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল বিশেষজ্ঞ প্যানেল

২০২৫ সালে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পর নিরাপত্তা পরিষদ একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেল পুনঃপ্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। প্যানেলটির দায়িত্ব ছিল নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ, সম্ভাব্য লঙ্ঘনের তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজন হলে নিরাপত্তা পরিষদের কাছে পরবর্তী পদক্ষেপের সুপারিশ করা।

তবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মতপার্থক্যের কারণে গত এক বছরে বিশেষজ্ঞদের নিয়োগই সম্পন্ন করা যায়নি। ফলে প্যানেলটি কার্যত কাজ শুরু করতে পারেনি। নতুন প্রস্তাবের মাধ্যমে সেই ম্যান্ডেট ধরে রাখার চেষ্টা করেছিল ওয়াশিংটন।

রাশিয়া ও চীনের ভেটোর ফলে সেই উদ্যোগও বন্ধ হয়ে গেল।

মস্কোর অভিযোগ, পশ্চিমাদের পদক্ষেপ ‘বিপজ্জনক’

ভোটের পর জাতিসংঘে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া ইরান ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থানের সমালোচনা করেন।

তাঁর বক্তব্য, পশ্চিমা দেশগুলোর নেওয়া পদক্ষেপ পারস্য উপসাগরীয় সংকটের সমাধান আরও জটিল করে তুলতে পারে। ইরান ইস্যুতে উত্তেজনা বাড়ায়—এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।

রাশিয়ার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবটির যথাযথ আইনি ভিত্তি ছিল না। মস্কো ও বেইজিং উভয়েই ইরানের পারমাণবিক প্রশ্নের সমাধানে কূটনৈতিক পথকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলে আসছে।

ওয়াশিংটনের উদ্বেগ ‘নজরদারিতে শূন্যতা’

যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নিয়েছে। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের উপ-রাষ্ট্রদূত জেনিফার লোকেটা বলেন, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেল না থাকলে নিরাপত্তা পরিষদ নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের বিষয়ে নিরপেক্ষ ও প্রমাণনির্ভর তথ্য পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম হারাবে।

ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, এতে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে একটি শূন্যতা তৈরি হবে এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সুবিধা পেতে পারে।

রাশিয়া-চীনকে ধন্যবাদ ইরানের

ভেটোর পর জাতিসংঘে ইরানের মিশন রাশিয়া ও চীনকে ধন্যবাদ জানিয়েছে।

তেহরানের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া প্রস্তাবটি ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নিরাপত্তা পরিষদকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের আরেকটি চেষ্টা রাশিয়া ও চীন ঠেকিয়ে দিয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান।

ইরানের এই বক্তব্য দেশটির নিজস্ব অবস্থান; যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা এর বিপরীতে বলছে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে স্বাধীন পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

‘স্ন্যাপব্যাক’ ঘিরেই বিরোধ

ইরানের ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পেছনে রয়েছে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি ঘিরে দীর্ঘদিনের বিরোধ।

ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ‘স্ন্যাপব্যাক’ ব্যবস্থা সক্রিয় করার পর ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক কর্মসূচি ঘিরে জাতিসংঘের আগের ছয়টি নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাব পুনর্বহাল হয়।

পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, তেহরান ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেছে। ইরান সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না বলে দাবি করে।

পুনর্বহাল হওয়া জাতিসংঘের ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে পারমাণবিক ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির ওপর বিধিনিষেধ, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদ জব্দ এবং অস্ত্রসংক্রান্ত বিধিনিষেধ রয়েছে।

ইরানের পরমাণুপ্রধানের সফরও আটকে যায়

নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উত্তেজনার মধ্যেই চলতি সপ্তাহে ইরানের পারমাণবিক সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ ইসলামির ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা বাতিল হয়।

জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইসলামির জন্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে প্রত্যাহারের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র আপত্তি জানানোর পর প্রয়োজনীয় ছাড় অনুমোদিত হয়নি। পরে অস্ট্রিয়া তাঁর ভিসা প্রত্যাহার করে বলে ইরানি পক্ষ জানায়।

ইরান ওই ঘটনাকেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য ছিল, নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত ওই কর্মকর্তাকে ছাড় দেওয়ার যথেষ্ট কারণ নেই।

আরও গভীর হচ্ছে বিভাজন

নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ ভোট ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা প্রশ্নে স্থায়ী সদস্যদের গভীর বিভাজন আবারও সামনে আনল।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ পশ্চিমা দেশগুলো নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে স্বাধীন আন্তর্জাতিক নজরদারি ধরে রাখার পক্ষে। বিপরীতে রাশিয়া ও চীন পশ্চিমাদের বর্তমান নিষেধাজ্ঞা নীতি ও নিরাপত্তা পরিষদে তার প্রয়োগ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে।

ফলে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলেও সেগুলো বাস্তবায়ন ও সম্ভাব্য লঙ্ঘন নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদকে স্বাধীনভাবে তথ্য দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় এখন নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হলো।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন