শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘খুব দেরি হওয়ার আগেই’ এআই নিয়ন্ত্রণের আহ্বান রাজা চার্লসের

স্কটল্যান্ডে গোপনীয় উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এনভিডিয়া, ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও গুগল ডিপমাইন্ডের শীর্ষ প্রতিনিধিরা • ভুল হাতে পড়লে ‘অস্তিত্বগত বিপদ’ তৈরির আশঙ্কা • আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অভিন্ন নীতিমালা চান ব্রিটিশ রাজা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতি একদিকে মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করছে, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণ হারালে এটি ভয়াবহ পরিণতিও ডেকে আনতে পারে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই কার্যকর সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরির জন্য বিশ্বের শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) স্কটল্যান্ডের আয়রশায়ারে ডামফ্রিস হাউসে এআই শিল্পের প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এসব কথা বলেন রাজা চার্লস।

বৈঠকে ছিলেন এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং, গুগল ডিপমাইন্ডের ডেমিস হাসাবিস, ওপেনএআইয়ের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা সারাহ ফ্রায়ার এবং ব্রিটেনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক মন্ত্রী কানিষ্ক নারায়ণ। অ্যানথ্রপিকের প্রতিনিধিও আলোচনায় অংশ নেন।

‘অস্তিত্বগত বিপদ’ নিয়ে সতর্কতা

রাজা চার্লস বলেন, এআইয়ের বিকাশের গতি ও সক্ষমতা একই সঙ্গে আকর্ষণীয় এবং গভীর উদ্বেগের বিষয়।

চিকিৎসা ও বিজ্ঞানের মতো ক্ষেত্রে এআই মানুষের জীবন উন্নত ও রক্ষায় ইতোমধ্যে ব্যাপক সম্ভাবনা দেখিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে প্রযুক্তিটির নির্মাতাদের মধ্য থেকেই এখন এর সম্ভাব্য বিপজ্জনক সক্ষমতা নিয়ে সতর্কবার্তা আসছে।

বিশেষ করে অত্যন্ত শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা ভুল ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে পড়লে এবং ধ্বংসাত্মক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হলে তার পরিণতি কী হতে পারে—তা এখনই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন ব্রিটিশ রাজা।

তিনি প্রশ্ন রাখেন, “Surely, then, we need sufficient means of control before it is all too late?”

অর্থাৎ, খুব বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই এআই নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন কি না—সেই প্রশ্ন প্রযুক্তি নেতাদের সামনে তুলে ধরেন তিনি।

মানুষের সেবায় থাকতে হবে প্রযুক্তি

এআইয়ের অগ্রগতি বন্ধ করার পরিবর্তে এর সুফল কাজে লাগানোর পাশাপাশি নিরাপত্তাকে কেন্দ্রে রাখার আহ্বান জানান রাজা চার্লস।

তাঁর মতে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব কেবল আরও শক্তিশালী প্রযুক্তি তৈরি করা নয়; সেই প্রযুক্তি যেন মানুষ, সমাজ ও প্রকৃতির কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

এ লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিভিন্ন দেশের মধ্যে ঐকমত্য তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বাকিংহাম প্যালেস জানিয়েছে, আলোচনার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল এআইয়ের ভবিষ্যৎ ব্যবহার পরিচালনায় অভিন্ন কিছু মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব কি না, তা বিবেচনা করা।

একই টেবিলে এআই দুনিয়ার প্রভাবশালীরা

রাজা চার্লসের এই বৈঠক এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন এআইয়ের বিকাশের গতি কমানো উচিত কি না—এ নিয়ে প্রযুক্তি শিল্পের ভেতরেই মতপার্থক্য ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।

এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং সমন্বিতভাবে এআই উন্নয়ন ধীর করার ধারণার সঙ্গে একমত নন। তাঁর অবস্থান হলো, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব প্রযুক্তি নিরাপদভাবে তৈরি ও যথেষ্ট পরীক্ষা করে বাজারে ছাড়তে হবে। কোনো পণ্য যথেষ্ট নিরাপদ না হলে সেটি প্রকাশ না করে আরও উন্নয়ন করা উচিত বলে বৈঠকের পর মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেইসহ এআই খাতের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি দ্রুত অগ্রসর হওয়া অত্যাধুনিক এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে উন্নয়নের গতি কমানোর পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন।

গবেষকের পদত্যাগে নতুন করে বিতর্ক

এআই নিরাপত্তা নিয়ে চলমান বিতর্ক সম্প্রতি আরও তীব্র হয়েছে অ্যানথ্রপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সনের পদত্যাগের পর।

কক্সন অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্বউন্নয়নক্ষম এআই তৈরির প্রতিযোগিতা মানবজাতির জন্য গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করেন। তাঁর বক্তব্যের পর এআই শিল্পের গতি, নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

এর মধ্যেই ওপেনএআই তাদের মডেলের ছয়টি ‘অপ্রত্যাশিত বা উদ্বেগজনক’ আচরণের ঘটনা প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি এ ধরনের ঘটনা শনাক্ত, তদন্ত ও প্রকাশের জন্য নতুন কাঠামো চালুর কথাও জানিয়েছে।

এআই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় বিভাজন

বিশ্বজুড়ে এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও প্রযুক্তিটির অগ্রগতি ধীর করার প্রশ্নে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে।

এক পক্ষ মনে করছে, অত্যন্ত ক্ষমতাধর এআই তৈরির আগে নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা জরুরি। অন্য পক্ষের যুক্তি, সামগ্রিকভাবে প্রযুক্তির গতি থামানোর পরিবর্তে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ উন্নয়ন ও পরীক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা। ফলে এআই নিরাপত্তার আলোচনা এখন শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং ভূরাজনীতির সঙ্গেও এটি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

আলোচনায় ব্রিটেনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

বিশ্বের সবচেয়ে বড় এআই কোম্পানিগুলোর অধিকাংশ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হলেও এআই নিরাপত্তা গবেষণায় যুক্তরাজ্য গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। দেশটির এআই নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অত্যাধুনিক মডেলের ঝুঁকি মূল্যায়ন ও পরীক্ষার কাজ করছে।

রাজা চার্লস এর আগেও ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এআইয়ের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি নিয়ে কথা বলেছেন। তবে এবারের আয়োজনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ একই টেবিলে বিশ্বের কয়েকটি শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের এনে সরাসরি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

রাজা বৈঠকে প্রায় ২০ মিনিট অবস্থান করার পর প্রযুক্তি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রতিনিধিরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যান। বৈঠক থেকে কোনো বাধ্যতামূলক চুক্তি হওয়ার কথা ছিল না।

এআইয়ের সম্ভাবনা ও ঝুঁকির এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই প্রযুক্তি নেতাদের সামনে রাজা চার্লসের বার্তা—অগ্রগতি চলবে, তবে মানুষের নিয়ন্ত্রণ ও মানবকল্যাণের লক্ষ্য হারিয়ে নয়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন