শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ওপেনএআইয়ের সঙ্গে গণিতবিদদের দ্বন্দ্ব তীব্র, গবেষণার স্বচ্ছতা ও কৃতিত্ব নিয়ে উদ্বেগ

প্রযুক্তি ডেস্ক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে জটিল ও দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত গাণিতিক সমস্যা সমাধানের প্রতিযোগিতা নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি গুরুতর বিতর্কও তৈরি করছে। গবেষণার কৃতিত্ব কার, এআই ব্যবহারের সময় দেওয়া তথ্য কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে এবং দ্রুতগতিতে তৈরি গাণিতিক প্রমাণ কতটা যাচাইযোগ্য—এসব প্রশ্নে ওপেনএআইসহ শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন বিশ্বের একদল খ্যাতিমান গণিতবিদ।

এ উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে ২৫ জন শীর্ষস্থানীয় গণিতবিদ একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাক্ষরকারীদের প্রত্যেকেই গণিতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ফিল্ডস মেডেল পেয়েছেন।

তাদের আশঙ্কা, বিখ্যাত ও কঠিন গাণিতিক সমস্যার সমাধানে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় এআই ল্যাবগুলো এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে, যা গণিত গবেষণার প্রচলিত উন্মুক্ত সংস্কৃতি, গবেষকের স্বীকৃতি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের ধারাবাহিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ওপেনএআইকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

বিতর্কটি আরও জোরালো হয় নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও গণিতবিদ ট্রিস্টান বাকমাস্টারের অভিযোগের পর।

বাকমাস্টারের দাবি, একটি গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক সমস্যা সমাধানে তার সঙ্গে কাজ করা অ্যানথ্রপিকের এক সহযোগীকে যথাযথ কৃতিত্ব না দিতে ওপেনএআইয়ের পক্ষ থেকে তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।

একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ওপেনএআইয়ের কোডেক্স ব্যবহার করে তারা যে গবেষণামূলক কাজ করেছিলেন, সেই কাজের কোনো অংশ পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক প্রমাণ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল কি না।

তবে এ অভিযোগের ভিত্তিতে ওপেনএআই গবেষকদের কাজ ব্যবহার করেছে—এমন সিদ্ধান্ত এখনো প্রতিষ্ঠিত নয়। বিষয়টি গবেষণার তথ্য ব্যবহার, স্বচ্ছতা ও যথাযথ স্বীকৃতি নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।

এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (ক্যালটেক) একটি গণিতবিষয়ক আয়োজনের স্পনসরশিপ প্রত্যাহার করে ওপেনএআই। বিশ্ববিদ্যালয়টির কয়েকজন গবেষকের সমালোচনার পর এ সিদ্ধান্ত আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এআইয়ের প্রমাণই শেষ কথা নয়

গণিতবিদদের আপত্তি অবশ্য এআই দিয়ে নতুন গাণিতিক আবিষ্কারের সম্ভাবনার বিরুদ্ধে নয়। বরং তাদের বক্তব্য—এআই কোনো জটিল সমস্যার সমাধান দিলেই সেটি গণিতশাস্ত্রের প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানের অংশ হয়ে যায় না।

একটি নতুন প্রমাণকে অন্য গণিতবিদদের যাচাই করতে হয়, এর পদ্ধতি ও নতুন ধারণাগুলো স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে হয় এবং আগের সংশ্লিষ্ট গবেষণার সঙ্গে এর সম্পর্ক নির্ধারণ করতে হয়।

খোলা চিঠিতে গণিতবিদেরা অভিযোগ করেছেন, এআইনির্ভর কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমাধান এত দ্রুত ঘোষণা করা হচ্ছে যে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা তৈরি, নতুন পদ্ধতি আলাদা করে চিহ্নিত করা কিংবা আগের গবেষকদের যথাযথভাবে উদ্ধৃত করার পর্যাপ্ত সময় থাকছে না।

তাদের মতে, এর ফলে গবেষণার কৃতিত্ব এবং সম্ভাব্য অনুকরণ বা মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওপেনএআইয়ের আলোচিত গাণিতিক প্রমাণটিও এখন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে চূড়ান্ত যাচাই পায়নি।

উন্মুক্ত গবেষণা কি গোপনীয় হয়ে উঠবে?

গণিতবিদদের আরেকটি বড় উদ্বেগ গবেষণার উন্মুক্ত সংস্কৃতি নিয়ে।

গবেষকেরা যদি মনে করেন, এআই টুলে তাদের দেওয়া ধারণা বা কাজ কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মডেল কিংবা গবেষণায় ব্যবহৃত হয়ে তাদের আগেই একই সমস্যার সমাধান প্রকাশে সহায়তা করতে পারে, তাহলে তারা প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষণা ও ধারণা ভাগাভাগিতে অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন।

এমন পরিস্থিতিতে বর্তমানে যে সহযোগিতামূলক ও উন্মুক্ত পরিবেশে গণিতের অনেক গবেষণা এগিয়ে যায়, তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল কম্পিউটিং সক্ষমতা রয়েছে। কোনো সম্ভাবনাময় গবেষণাপথ চিহ্নিত হলে তারা বিপুল অর্থ ব্যয় করে বৃহৎ ভাষা মডেল ব্যবহার করে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চালাতে পারে। এর ফলে গবেষকদের মধ্যে নিজেদের কাজ গোপন রাখার প্রবণতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আগেও এসেছে ‘লেইডেন ঘোষণা’

এটি অবশ্য গণিতবিদদের প্রথম সতর্কবার্তা নয়। চলতি বছরের জুনে গণিতবিদদের একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ ‘লেইডেন ডিক্লারেশন’ প্রকাশ করে।

সেখানে বৃহৎ ভাষা মডেল বা এলএলএম দিয়ে তৈরি গাণিতিক প্রমাণ ভবিষ্যতে গবেষণার ধরন কীভাবে বদলে দিতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি গণিতবিদ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের জন্য বেশ কিছু সুপারিশও তুলে ধরা হয়।

গণিতবিদদের বক্তব্য, গণিতের মূল্য শুধু কোনো সমস্যার চূড়ান্ত প্রমাণে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন গবেষক তৈরি, নতুন প্রশ্নের জন্ম, ধারণার ব্যাখ্যা, পারস্পরিক যাচাই এবং নতুন আবিষ্কারকে মানুষের সামগ্রিক জ্ঞানভান্ডারের সঙ্গে যুক্ত করার প্রক্রিয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তাদের সতর্কতা আরও বিস্তৃত—গণিতের জগতে যে প্রশ্নগুলো এখন সামনে এসেছে, এআইয়ের বিস্তারের সঙ্গে একই ধরনের সংকট বিজ্ঞান, সফটওয়্যার প্রকৌশল ও অন্যান্য সৃজনশীল পেশাতেও দেখা দিতে পারে।

ফলে বিতর্কটি শেষ পর্যন্ত শুধু ‘মানুষ বনাম এআই’ কিংবা কোনো গাণিতিক প্রমাণের কৃতিত্ব কার—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং এআই যখন মানুষের কাজের ধরন আমূল বদলে দিচ্ছে, তখন জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষকের স্বীকৃতি, স্বচ্ছতা এবং মানবিক বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য কীভাবে রক্ষা করা হবে—সেই বৃহত্তর প্রশ্নই সামনে আসছে।

সূত্র: টেকক্রাঞ্চ


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন