রেকর্ড জ্বালানি আমদানি ব্যয় অর্থনীতিতে অশনিসংকেত
- প্রান্তকাল ডেস্ক
- ২ ঘণ্টা আগে
এক বছরেই খরচ দ্বিগুণের বেশি
জ্বালানি আমদানিতে রেকর্ড ১০.৬৩ বিলিয়ন ডলার • মোট আমদানি ব্যয়ের ১৪ শতাংশই গেছে তেলে • বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ২৭.২৯ বিলিয়ন ডলার • মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ওপরে • নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসেও জ্বালানি ব্যয়ে বড় উল্লম্ফন
বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ হয়ে উঠছে জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান আমদানি ব্যয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে রেকর্ড ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। শুধু মূল্যবৃদ্ধি নয়, আমদানির পরিমাণও বেড়েছে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, পরিবহন ও বীমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং দেশে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা যুক্ত হয়ে সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন চাপের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে নতুন অর্থবছরের শুরু। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েই জ্বালানি আমদানিতে প্রায় ১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা, উৎপাদন খরচ এবং শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতিতে তার প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তবে অর্থনীতির সব সূচকই নেতিবাচক নয়। রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন জ্বালানির বাড়তি বিল সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সুরক্ষা দিচ্ছে। তাই পরিস্থিতিকে তাৎক্ষণিক সংকটের চেয়ে অর্থনীতির জন্য বড় সতর্কসংকেত হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
এক বছরে ৫.১৪ থেকে ১০.৬৩ বিলিয়ন ডলার
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ মাত্র এক বছরে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১০৭ শতাংশ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট পণ্য আমদানি হয়েছে প্রায় ৭৫ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের পেছনেই গেছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মোট আমদানি ব্যয়ের প্রায় ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশ জ্বালানির জন্য ব্যয় হয়েছে।
প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৮০ পয়সা হিসাবে গত অর্থবছরের জ্বালানি আমদানি ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশে এর আগে এক অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতে এত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়নি।
আগের রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে
এর আগে সর্বোচ্চ জ্বালানি আমদানি ব্যয় হয়েছিল ২০২০-২১ অর্থবছরে। সে সময় করোনা মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ও শিল্প উৎপাদন দ্রুত সচল হতে শুরু করায় জ্বালানির চাহিদা ও দাম দুটিই বেড়ে যায়।
ওই অর্থবছরে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় প্রায় ৮ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারের ব্যয় সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।
পরিশোধিত তেলেই গেছে ৯.৪৪ বিলিয়ন ডলার
জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোলিয়াম, অয়েল ও লুব্রিকেন্ট বা POL আমদানিতে প্রায় ৯ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। আগের অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল প্রায় ৪ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ব্যয় এক বছরে প্রায় ১০৯ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম আমদানির ব্যয় প্রায় ৯২ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরে তা ছিল প্রায় ৬২৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ডিজেল, ক্রুড অয়েল, ফার্নেস অয়েল, জেট ফুয়েলসহ বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি আমদানি করে। ফলে বিশ্ববাজারের মূল্য পরিবর্তনের প্রভাব দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ে দ্রুত পড়ে।
শুধু দাম নয়, আমদানির পরিমাণও বেড়েছে
রেকর্ড ব্যয়কে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। দেশে জ্বালানি আমদানির পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে বাংলাদেশ প্রায় ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টন জ্বালানি আমদানি করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ লাখ ৫ হাজার টন।
অর্থাৎ নয় মাসেই আমদানির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৭ লাখ ৩৫ হাজার টন, বা প্রায় ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট জ্বালানি তেলের চাহিদা ছিল প্রায় ৭৪ লাখ টন।
এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৬২ লাখ ১৫ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছিল। এর প্রায় ২৪ শতাংশ ছিল অপরিশোধিত এবং ৭৬ শতাংশ পরিশোধিত তেল।
যুদ্ধের ধাক্কায় বদলে যায় হিসাব
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তোলে।
বাংলাদেশ ব্যাংকও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে পণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরির কথা উল্লেখ করেছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বিঘ্ন শুধু জ্বালানির দাম নয়, জাহাজভাড়া ও বীমা ব্যয়েও চাপ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ক্ষেত্রে তাই বিশ্ববাজারে এক ব্যারেল তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু বিপিসির ক্রয়মূল্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসেই সতর্কবার্তা
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রেকর্ড ব্যয়ের পর নতুন অর্থবছরের শুরুতেও জ্বালানি আমদানির উচ্চ ব্যয় অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাইয়ে প্রায় ১ দশমিক ৩৭৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি হয়েছে। আগের বছরের একই মাসে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জুলাই মাসেই ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৮৩ শতাংশ।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, জুলাইয়ের মোট পণ্য আমদানি ব্যয়ের ২০ শতাংশের বেশি চলে গেছে জ্বালানিতে।
এক মাসের তথ্য দিয়ে পুরো অর্থবছরের প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না। তবে বছরের শুরুতেই জ্বালানি আমদানিতে এত বড় ব্যয় ভবিষ্যৎ বৈদেশিক মুদ্রা চাহিদার জন্য সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
বাণিজ্য ঘাটতিও বড় হয়েছে
জ্বালানির উচ্চ আমদানি ব্যয়ের বিষয়টি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতিও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ব্যালান্স অব পেমেন্টস তথ্য অনুযায়ী, পণ্য রপ্তানি ছিল প্রায় ৪৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার, বিপরীতে আমদানি ছিল প্রায় ৭১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার।
ফলে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ২০ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ এক বছরে পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৬ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।
জ্বালানি আমদানি বৃদ্ধিই এই পুরো ঘাটতির একমাত্র কারণ নয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেশি আমদানি ব্যয়ের পেছনে পেট্রোলিয়াম, এলএনজি ও সারের উচ্চ ব্যয়ের কথা উল্লেখ করেছে।
চলতি হিসাবেও চাপ
বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লে সাধারণত বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবেও চাপ পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চলতি হিসাবের ঘাটতি ছিল মাত্র ১৩৯ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ১ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ সত্ত্বেও বড় বাণিজ্য ঘাটতি এবং প্রাইমারি ইনকাম ঘাটতির কারণে চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়েছে।
এখানেই জ্বালানি ব্যয়ের সামষ্টিক অর্থনৈতিক গুরুত্ব। আমদানি বিল দ্রুত বাড়তে থাকলে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স থেকে আসা বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশ আমদানি দায় পরিশোধে চলে যায়।
মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ওপরে
দেশের সাধারণ মানুষের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি মূল্যস্ফীতি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাবে আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে এসেছে। জুলাইয়ে তা ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।
আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশ হলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এখানে উদ্বেগের আরেকটি দিক রয়েছে। বার্ষিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও আগস্টে আগের মাসের তুলনায় সাধারণ মূল্যসূচক ২ দশমিক ৩১ শতাংশ এবং খাদ্যের মূল্যসূচক ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেড়েছে।
অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং আগের বছরের তুলনায় দাম বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে।
তেলের দাম বাড়লে কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে চাপ
জ্বালানি এমন একটি পণ্য, যার মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ডিজেলের দাম বাড়লে বাস-ট্রাক ও পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়তে পারে। কৃষিতে সেচ ও যান্ত্রিক কার্যক্রমের ব্যয় বাড়তে পারে। শিল্পকারখানায় নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ও লজিস্টিক ব্যয় বাড়ে। জাহাজ ও বিমান পরিবহনেও জ্বালানি ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চ দাম দীর্ঘায়িত হলে তা প্রথমে আমদানি ব্যয় এবং পরে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ের মাধ্যমে সাধারণ মূল্যস্তরে প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনীতিতে একে অনেক সময় দ্বিতীয় দফার বা পরোক্ষ মূল্যস্ফীতির চাপ হিসেবে দেখা হয়।
ডলারের ওপর চাপ তৈরির ঝুঁকি
জ্বালানি আমদানি সাধারণত বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। ফলে আমদানি ব্যয় ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে চলে যাওয়া মানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হওয়া।
এই চাহিদা যদি একই সময়ে রপ্তানি, রেমিট্যান্স, বিদেশি বিনিয়োগ ও অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ দিয়ে পূরণ করা না যায়, তাহলে বিনিময় হার ও রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
আর টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বাড়লে একই পরিমাণ জ্বালানি কিনতেও টাকার হিসাবে আরও বেশি ব্যয় হয়। ফলে তৈরি হতে পারে একটি চক্র—জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্য বৃদ্ধি, ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যস্তরে চাপ।
স্বস্তির জায়গা রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ
তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে একতরফাভাবে সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের বহিঃখাতের কয়েকটি সূচক বড় ধরনের সুরক্ষা দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও প্রবাসী আয় শক্তিশালী ছিল। জুলাই ২০২৬-এও রেমিট্যান্স আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেড়ে ২ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও আগের সংকটকালীন অবস্থার তুলনায় পুনর্গঠিত হয়েছে।
অর্থাৎ জ্বালানির রেকর্ড ব্যয় উদ্বেগের কারণ হলেও দেশ এখনই জ্বালানি আমদানির অর্থ পরিশোধে অক্ষম—এমন কোনো তথ্য নেই।
সিপিডির তৌফিকুল ইসলাম খান যা বলছেন
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে দেশে বাড়তে থাকা চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি—দুই কারণকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবছরই দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়ছে। এর মধ্যে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজার উত্তপ্ত হয়ে তেলের দাম বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে বাংলাদেশকে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিমও উচ্চ মূল্য ও চাহিদা বৃদ্ধিকে রেকর্ড আমদানি ব্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
চার মাস ধরে ডিজেল ১১৫ টাকা
আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা থাকলেও সরকার এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে ডিজেলের দাম আরও বাড়ায়নি।
বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
১ জুন ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা অপরিবর্তিত রেখে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারে পাঁচ টাকা করে বাড়ানো হয়েছিল। এরপর জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরেও একই মূল্য বহাল রাখা হয়েছে।
এতে আপাতত পরিবহন ও উৎপাদন খাতে নতুন করে সরাসরি জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা আসেনি। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ দাম দীর্ঘস্থায়ী হলে অভ্যন্তরীণ মূল্য সমন্বয়ের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
কেন ‘অশনিসংকেত’
এক বছরে জ্বালানি আমদানি ব্যয় ১০৭ শতাংশ বৃদ্ধি, নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসেই জ্বালানি ব্যয়ে ৮৩ শতাংশের বেশি উল্লম্ফন, বাণিজ্য ঘাটতি ২৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়ানো, চলতি হিসাবে ঘাটতি বৃদ্ধি এবং একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে থাকা—এসব সূচক একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে জ্বালানি আমদানির ক্রমবর্ধমান ব্যয়কে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
তবে ‘অশনিসংকেত’ মানেই অর্থনীতি ইতোমধ্যে সংকটে পড়ে গেছে—এমন নয়। বরং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে কোন কোন পথে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ আসতে পারে, বর্তমান সংখ্যাগুলো সেই ঝুঁকিই সামনে আনছে।
এখন প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি আমদানির চাপ সামাল দিতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই ধরনের কৌশল প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারের গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে সুবিধাজনক সময়ে ক্রয়, পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুত, সরবরাহ উৎস বহুমুখীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সুবিধা-অসুবিধা যাচাই করা জরুরি।
একই সঙ্গে দেশের পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্বালানির অপচয় কমানো, শিল্প ও পরিবহনে দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সৌরসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানো প্রয়োজন।
কারণ বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ শুধু পর্যাপ্ত জ্বালানি আমদানি করা নয়; বরং কত দামে সেই জ্বালানি কিনতে হচ্ছে এবং তার জন্য অর্থনীতিকে কতটা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
রেকর্ড আমদানি ব্যয়ের বর্তমান ধারা যদি আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা, বাণিজ্য ভারসাম্য, উৎপাদন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর একযোগে চাপ তৈরি হতে পারে। আর সেই কারণেই জ্বালানি তেলের এই রেকর্ড আমদানি ব্যয় বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অশনিসংকেত।
এই বিভাগের আরও খবর
আরেক দফায় বাড়ল জেট ফুয়েলের দাম, লিটার ১৬৫ টাকা ৬৫ পয়সা
আগস্টের পর সেপ্টেম্বরেও মূল্যবৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ রুটে লিটারে বেড়েছে…
বিদেশ ভ্রমণে ডলার ব্যবহারের সীমা বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক
প্রাপ্তবয়স্করা বছরে পাবেন সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ডলার, নগদ…
দাম বাড়িয়েও মিলছে না এক লিটারের সয়াবিন তেল, চিনি-মুরগি-ডিমেও বাড়তি চাপ
বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর পরও রাজধানীর খুচরা…
ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়নে ১ বিলিয়ন ডলার দিচ্ছে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক
বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন…
আমদানি ব্যয় ও আন্তর্জাতিক বাজার বুঝেই সয়াবিনের দাম সমন্বয়
আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও…
সর্বশেষ খবর
1.
জনপ্রিয় বিভাগ সমূহ
আরও পড়ুন
নিরাপদ সমুদ্রপথ ছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য এগোবে না: ব্রিকস সম্মেলনে মোদী
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ব্রিকস সম্মেলনে ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরেছেন এবং নিরাপদ সমুদ্র পথের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।…
উপকূলীয় এলাকার উন্নয়নে যা যা চাইলেন দক্ষিণের সাংবাদিকরা
বৃহত্তর দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়কটি ছয় লেইনে উন্নীত করার দাবি জানিয়েছে বরিশাল বিভাগ…
নরসিংদীতে শীতলক্ষ্যায় গোসলে নেমে নারীসহ ৪ জন নিখোঁজ
নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসলে নেমে পানিতে ডুবে নারী ও শিশুসহ চারজনের নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৪টায়…
বরিশালে সমকাল কার্যালয়ে সাবেক ব্যুরো প্রধানের ঝুলন্ত লাশ
বরিশাল নগরীতে দৈনিক সমকাল কার্যালয় থেকে সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বরিশাল মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানার এসআই…
প্রেমের বিয়ে অস্বীকার, নবজাতক ফেলে পালানোর চেষ্টা
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে চলন্ত সিএনজি চালিত অটোরিকশা থেকে সদ্য ভূমিষ্ঠ এক ছেলে নবজাতককে রাস্তায় ফেলে দেওয়ার অভিযোগ…
গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ; নৈরাজ্যের প্রতিবাদে বহদ্দারহাটে ক্যাবের র্যালী ও অবস্থান কর্মসূচি
বাস, মিনিবাস, টেম্পু ও হিউম্যান হলারসহ বিভিন্ন গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধ এবং যাত্রী হয়রানি রোধের দাবিতে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট চত্বরে প্রতিবাদী র্যালী…
ছয় বিল পাস, ৯ বৈঠক শেষে ত্রয়োদশ সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপ্তি
নিজস্ব প্রতিবেদক গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার সুরক্ষা ও সম্পত্তি হস্তান্তরসহ গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি বিল পাসের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের…
সিরাজদিখানে মিথ্যা তথ্য প্রচার ও চাঁদা দাবির অভিযোগের প্রতিবাদে মানববন্ধন
মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার এবং চাঁদা দাবির অভিযোগের প্রতিবাদে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মানববন্ধন থেকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত,…

