তৃণমূলের শিল্পায়নে নতুন প্রাণ আনতে বিসিকের মহাপরিকল্পনা
- নিজস্ব প্রতিবেদক
- ১ ঘণ্টা আগে
দেশের শিল্পায়নকে রাজধানীকেন্দ্রিকতার গণ্ডি থেকে বের করে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রায় সাত দশক আগে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। সময়ের সঙ্গে দেশের শিল্প ও অর্থনীতির চিত্র বদলেছে, বেড়েছে উৎপাদন ও পরিবহনের পরিধি। তবে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেক পুরোনো শিল্পনগরীর অবকাঠামো আধুনিক করা সম্ভব হয়নি।
এবার সেই বাস্তবতা বদলাতে বড় ধরনের সংস্কার ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বিসিক। দেশের ৮৪টি শিল্পনগরী ও পার্কের অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা জোরদার, বন্ধ ও রুগ্ন কারখানা পুনরায় সচল, অব্যবহৃত শিল্পপ্লট দ্রুত বরাদ্দ এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বিসিকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন শিল্পনগরী সরেজমিনে পরিদর্শন করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছেন। বাসসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি তুলে ধরেছেন বিসিকের বর্তমান বাস্তবতা, চলমান উদ্যোগ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা।
বেনজীর আহমেদ বলেন, দেশের অনেক শিল্পনগরী কয়েক দশক আগে গড়ে উঠেছিল। তখনকার শিল্প ও পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ষাটের দশকে যখন এসব শিল্পনগরী নির্মাণ করা হয়, তখন ভারী ট্রাক ও লরির চলাচল ছিল সীমিত। সে সময়ের প্রয়োজন বিবেচনায় অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছিল। এখন শিল্পকারখানায় কাঁচামাল আনা এবং উৎপাদিত পণ্য পরিবহনে নিয়মিত ভারী যানবাহন চলাচল করছে। ফলে পুরোনো অনেক সড়ক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শুধু সড়ক নয়, অনেক শিল্পনগরীতে ড্রেনেজ, আলোকসজ্জা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও আধুনিকায়নের প্রয়োজন রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান বিসিক চেয়ারম্যান।
নিরাপত্তার বিষয়টিও নতুন পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। পুরোনো অনেক শিল্পনগরীতে পর্যাপ্ত সীমানাপ্রাচীর নেই, কোথাও নিরাপত্তা গেট নষ্ট, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় আলো বা সিসিটিভির ব্যবস্থা নেই।
বেনজীর আহমেদ বলেন, উদ্যোক্তাদের নিরাপদ ও উন্নত শিল্পপরিবেশ নিশ্চিত করতে বিসিকের প্রকৌশল বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো চিহ্নিত করা হচ্ছে। অগ্রাধিকারভিত্তিতে শিল্পনগরীগুলো সংস্কার ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিসিকের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো বন্ধ ও রুগ্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা।
তিনি জানান, বর্তমানে বিসিকের আওতায় রয়েছে ৬ হাজার ২২৩টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বিভিন্ন কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান রুগ্ন হয়ে পড়েছে, আবার কিছু কারখানা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কেন কারখানাগুলো বন্ধ হয়েছে এবং সেগুলো পুনরায় চালু করতে উদ্যোক্তাদের কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন- সেটি চিহ্নিত করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে বিসিক।
এ জন্য প্রতিটি শিল্পনগরীর প্রধানকে বন্ধ ও রুগ্ন কারখানার বিস্তারিত তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তালিকায় কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণ, বর্তমান অবস্থা এবং সম্ভাব্য সমাধানের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
তবে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগে ইতোমধ্যে কিছু অগ্রগতিও হয়েছে। গত ছয় মাসে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মসূচির আওতায় ৪৩টি বন্ধ মিল ও কারখানাকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
বেনজীর আহমেদ বলেন, লক্ষ্য শুধু বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা নয়; সম্ভাবনাময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যাতে ভবিষ্যতে সংকটে পড়ে বন্ধ না হয়, সে জন্য আগাম সমস্যা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থাও করা হবে।
নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণেও জোর দিচ্ছে বিসিক। পুরোনো ও নতুন শিল্পপার্কে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত বা বরাদ্দবিহীন থাকা প্লটগুলো দ্রুত নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে ১ হাজার ৬০০টির বেশি শিল্পপ্লট বরাদ্দের জন্য নতুন করে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। দ্রুত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এসব প্লটে শিল্প স্থাপনের সুযোগ তৈরি করতে চায় বিসিক।
বিসিক চেয়ারম্যানের মতে, অব্যবহৃত প্লটগুলোতে নতুন শিল্প স্থাপন করা গেলে একদিকে বিনিয়োগ বাড়বে, অন্যদিকে সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।
দেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতের অন্যতম বড় ভিত্তি বিসিকের আওতাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বর্তমানে প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতেও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিসিক। দক্ষ উদ্যোক্তা ও কর্মী তৈরি করা গেলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেনজীর আহমেদের ভাষায়, বিসিককে শুধু শিল্পপ্লট বরাদ্দকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না তিনি। তৃণমূলের উদ্যোক্তাদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিসিককে গড়ে তোলাই তার লক্ষ্য।
সে লক্ষ্য পূরণে শিল্পনগরীর রাস্তা, ড্রেনেজ, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামো আধুনিক করার পাশাপাশি বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করা, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিসিক চেয়ারম্যান মনে করেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পায়নের যে ভিত্তি বিসিক ইতোমধ্যে তৈরি করেছে, সেটিকে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত অবকাঠামো ও নতুন বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে তৃণমূলের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
তিনি বলেন, শিল্পনগরীগুলো নিরাপদ, আধুনিক ও উদ্যোক্তাবান্ধব হয়ে উঠলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। বন্ধ কারখানা চালু হলে উৎপাদন বাড়বে, নতুন শিল্প স্থাপিত হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহও বাড়বে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে পারে ঢাকার বাইরে শিল্পায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক শিল্প ও রপ্তানি সক্ষমতাও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
ছয় দশকের বেশি সময় ধরে দেশের শিল্পায়নের ভিত্তি গড়ে তোলা বিসিকের সামনে এখন তাই শুধু পুরোনো অবকাঠামো সংস্কারের কাজ নয়; বরং পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুরো শিল্প সহায়তা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর সুযোগ।
পরিকল্পিত আধুনিকায়ন, বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পুনরুজ্জীবন এবং নতুন বিনিয়োগের সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তৃণমূলের শিল্পায়নে নতুন গতি আসবে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও শক্তিশালী শিল্পভিত্তি গড়ে উঠবে বলে আশা করছেন বিসিক চেয়ারম্যান।
এই বিভাগের আরও খবর
সরকারি মাধ্যমে হজ পালনে নানা সুবিধা, বেসরকারিতে ঝুঁকি : ধর্মবিষয়ক সচিব
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সি আলাউদ্দিন আল আজাদ বলেছেন,…
এআইকে উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচি হিসেবে নিতে হবে : জনপ্রশাসন উপদেষ্টা
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন…
পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে কাজ করছে সরকার : হুমায়ুন কবির
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ…
গণতন্ত্র শক্তিশালী হলেই সব সম্প্রদায়ের অধিকার-মর্যাদা নিশ্চিত হবে: রাষ্ট্রপতি
দেশে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের…
জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে চায় শেভরন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানেও আগ্রহ
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মোকাবিলায় বিনিয়োগ আরও সম্প্রসারণের…
সর্বশেষ খবর
3.
4.
5.
জনপ্রিয় বিভাগ সমূহ
আরও পড়ুন
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে হেফাজত
সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল-২০২৬-এর কয়েকটি বিধান নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তা সংশোধনের দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম…
ছিনতাইকারী চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে সিটিটিসি
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)।…
বাউফলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নতুন উপজেলা কমিটি গঠন
পটুয়াখালীর বাউফলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ উপজেলা শাখার নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বাউফল উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে…
৩২ লাখ টাকার সেতু, পারাপারে ভরসা সুপারি গাছ
সরকারি অর্থে সেতু নির্মাণ করা হলেও সংযোগ সড়ক, সুরক্ষা দেয়ালসহ আনুষঙ্গিক কাজ শেষ না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সুপারি গাছ ও…
তারেক রহমানের উদ্যোগে নতুন বাড়ি পেল ছয় পরিবার
ফেনীতে নিহত যুবদল নেতার পরিবার ও চৌদ্দগ্রামে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচ পরিবারের হাতে চাবি তুলে দিল ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ প্রধানমন্ত্রী ও…
আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি উন্নয়ন বাধা দূর করতে হবে: সালাউদ্দিন টুকু
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে তা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী…
ফ্রান্সে বৈধ শ্রমবাজার সম্প্রসারণ চায় বাংলাদেশ
ফরাসি সিনেটরদের সঙ্গে বৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী; ওষুধ, চামড়া, সিরামিক ও পাটপণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি ফরাসি বিনিয়োগের আহ্বান বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য…
‘নগরায়ণ মানে শুধু ভবন-সড়ক নয়, মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে হবে’
দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নগর পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখার আহ্বান স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর নগরায়ণকে শুধু বড় ভবন, সড়ক কিংবা পানি ও স্যানিটেশন…

