রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬

ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

‘ভবিষ্যতে কোনো সরকার যাতে স্বৈরাচারী হতে না পারে, সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা হবে’

ঢাকা, ৮ আগস্ট ২০২৬:
ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঠেকাতে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে জাতীয় ঐক্য অটুট রাখার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কার এগিয়ে নিতে সহনশীলতা, গণতান্ত্রিক চর্চা ও রাজনৈতিক সংলাপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

শনিবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন মিলনায়তনে ‘ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এর দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দল ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব) যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

সভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের আহ্বায়ক ও ইউট্যাবের মহাসচিব অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।

‘জুলাইয়ের বিজয় কোনো গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়’

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং শহীদদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিজয় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের বিষয় নয়।

তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ যাতে নতুন কোনো রূপে ফিরে আসতে না পারে, সেজন্য রাজনৈতিক উসকানি ও বিভাজনের ফাঁদ এড়িয়ে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে শক্তিশালী করার পাশাপাশি রাজনৈতিক সহনশীলতা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করার পরিকল্পনা

রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচিত সরকার যেন দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য সাংবিধানিক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে সীমিত করার বিধান সংবিধানে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সংসদের উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের মধ্যে ভারসাম্য বা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ প্রতিষ্ঠার কথাও বলেন তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমদের ভাষ্য, বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সময়ের প্রয়োজন ও জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী তাদের সংবিধানে পরিবর্তন এনেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তৈরি হওয়া জনআকাঙ্ক্ষাকে বিবেচনায় নিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সাংবিধানিক সংস্কার প্রয়োজন।

তরুণদের উসকানিতে পা না দেওয়ার আহ্বান

শিক্ষার্থী ও তরুণদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও অপরিপক্ব বা উসকানিমূলক বক্তব্য পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে পারে।

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত বা সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের ধৈর্য, সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিবাদ ও মত প্রকাশের আহ্বান জানান তিনি।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে সমতার ভিত্তিতে

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিষয়েও বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা এবং সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত।

ভারতের ভূখণ্ড থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা বক্তব্য পরিচালনার সুযোগ দেওয়া এবং একই সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রত্যাশা—এই দুই অবস্থান একসঙ্গে চলতে পারে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ভারতকে এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান উপলব্ধি করতে হবে এবং দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক ইস্যুকে ব্যবহার না করাই উভয় দেশের জন্য ইতিবাচক হবে।

শহীদ পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য

অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা তাঁদের অনুভূতি তুলে ধরেন। শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ, শহীদ ওয়াসিম আকরামের পিতা শফিউল আলম, শহীদ আবু সাঈদের ভাই মো. আবু হোসেন এবং শহীদ একরামুল হক সাজিদের মা নাজমা খাতুন লিপি বক্তব্য দেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের হাতে বিশেষ সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।

পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন।

আলোচনা সভায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন