অনুসরণ করুন:
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

ভারতে মুসলিম প্রতিষ্ঠাতার বিশ্ববিদ্যালয় ভাঙার উদ্যোগ ঘিরে উত্তেজনা

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সরকারের আইনি অবস্থান এবং রাজনৈতিক বিতর্ক

ভারতের উত্তর প্রদেশের রামপুর জেলার মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রাজ্যের উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০টি ভবনের মধ্যে ৩৮টিকে অবৈধ নির্মাণ দাবি করে সেগুলো অপসারণের নির্দেশ দেওয়ায় শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা সমাজবাদী পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা আজম খান। তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বহু বছর ধরে রামপুর অঞ্চলের উচ্চশিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তবে উত্তর প্রদেশের বিজেপি সরকারের দাবি, অধিকাংশ ভবন প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত হয়েছে এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী সেগুলো বৈধ করা সম্ভব নয়।

প্রশাসনের অভিযোগ

রামপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (আরডিএ) জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ভবন নির্মাণে বিধিবদ্ধ অনুমোদনের ঘাটতি রয়েছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, মাত্র দুটি স্থাপনা যথাযথ অনুমোদন নিয়ে নির্মিত হয়েছে। সেই কারণে অবৈধ স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

যদিও পরে প্রশাসন একটি অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করেছে, তবুও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে এটি স্থায়ী সমাধান নয়। তাদের দাবি, এটি কেবল নির্ধারিত সময়সীমা সাময়িকভাবে পিছিয়েছে; মূল ভাঙার আদেশ এখনো বহাল রয়েছে এবং তারা আদালতের মাধ্যমে সেটি বাতিলের চেষ্টা করছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের যুক্তি

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, ভবনগুলো নির্মাণের সময় সংশ্লিষ্ট এলাকা রামপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটির আওতায় ছিল না। ফলে সে সময় বর্তমান কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের প্রশ্নই ওঠে না।

তাদের আরও বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন একাডেমিক কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনপ্রাপ্ত। তাই বহু বছর পর নতুন প্রশাসনিক ব্যাখ্যার ভিত্তিতে পুরো অবকাঠামোকে অবৈধ ঘোষণা করা আইনগত ও সাংবিধানিক প্রশ্নের জন্ম দেয়।

শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়ন করছে। ভাঙার নির্দেশ জারির পর থেকে একদল শিক্ষার্থী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে।

অনেক শিক্ষার্থীর আশঙ্কা, বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেলে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বলছে, পরিবার নিরাপদ পরিবেশ বিবেচনা করেই তাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের সুযোগ থাকলেও অনেক পরিবারের পক্ষে তা গ্রহণ করা সহজ হবে না।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নারী এবং প্রতিষ্ঠানে হিন্দু শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কম নয়। তাদের মতে, এটি সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয় হলেও এখানে বিভিন্ন ধর্মের শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে পড়াশোনা করছে।

রাজনৈতিক বিতর্ক

সমাজবাদী পার্টির নেতারা অভিযোগ করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে। তাদের মতে, আজম খানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ এবং প্রতিষ্ঠানটির সংখ্যালঘু চরিত্র—দুই কারণেই এটি চাপের মুখে পড়েছে।

অন্যদিকে বিজেপির অবস্থান ভিন্ন। দলটির নেতারা বলছেন, এটি কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়; বরং অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তাদের দাবি, আইন সবার জন্য সমান এবং অনুমোদনবিহীন স্থাপনার ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

আজম খানকে ঘিরে আইনি প্রেক্ষাপট

২০১৭ সালে উত্তর প্রদেশে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আজম খানের বিরুদ্ধে ভূমি দখল, জালিয়াতি, বিদ্বেষমূলক বক্তব্যসহ বিভিন্ন অভিযোগে অসংখ্য মামলা দায়ের হয়। তিনি দীর্ঘ সময় কারাগারেও ছিলেন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন মামলায় আদালতের মুখোমুখি হন।

তাঁর সমর্থকদের দাবি, এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে রাজ্য সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

বৃহত্তর প্রেক্ষাপট

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নামে বাড়িঘর, দোকান, ধর্মীয় স্থাপনা ও অন্যান্য ভবন ভাঙার ঘটনাকে ঘিরে বিতর্ক বেড়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন অভিযোগ করেছে, এসব অভিযানে মুসলিম সম্প্রদায় তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বরাবরই বলছে, এসব পদক্ষেপ সম্পূর্ণ আইনানুগ এবং অবৈধ দখল ও অনুমোদনহীন নির্মাণের বিরুদ্ধেই পরিচালিত হচ্ছে।

অনিশ্চয়তার মধ্যে শিক্ষার্থীরা

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি, বিষয়টি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ভবন রক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন, উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন