অনুসরণ করুন:
রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

পাঁচ দশকের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ পুলিশে নারীর নেতৃত্বের নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশ পুলিশে নারীদের অন্তর্ভুক্তির যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। সীমিত দায়িত্বে কর্মজীবন শুরু করা সেই নারী সদস্যরা আজ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরে দায়িত্ব পালন করছেন। কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পর্যন্ত পদোন্নতির এই অগ্রযাত্রা দেশের পুলিশ বাহিনীতে নারীর সক্ষমতা ও নেতৃত্বের এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাহিনীতে প্রায় ১৭ হাজার ৯৭০ জন নারী সদস্য কর্মরত রয়েছেন, যা মোট জনবলের প্রায় ৯ দশমিক ০৭ শতাংশ। মহানগর ও জেলা পুলিশ ছাড়াও অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), হাইওয়ে পুলিশ, নৌ পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, পুলিশ সদর দপ্তর এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনেও তারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।

শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক গাজী জসিম উদ্দিন বলেন, পেশাগত দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে নারী সদস্যরা প্রমাণ করেছেন যে দায়িত্ব পালনে তারা কোনো ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই। তাঁর মতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে অধিকাংশ শ্রমিক নারী হওয়ায় শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ, বিরোধ নিরসন এবং আস্থা তৈরিতে নারী পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত কার্যকর।

শিল্প পুলিশ ইউনিট-৩, চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম জানান, কর্মজীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন, নারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত ও সেবার মান উন্নত করেছে। বিশেষ করে ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা বা নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ভুক্তভোগীরা নারী কর্মকর্তাদের কাছে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে সহজে তুলে ধরতে পারেন। এতে তদন্তে প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ আরও কার্যকর হয়।

তিনি বলেন, বর্তমানে নারী পুলিশ সদস্যদের জন্য পদোন্নতি ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত হয়েছে। জ্যেষ্ঠ নারী কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব ও পরামর্শ নতুন প্রজন্মের সদস্যদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে এবং আরও বেশি নারীকে পুলিশ পেশায় যোগ দিতে উৎসাহিত করছে।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, অগ্রগতি সত্ত্বেও নেতৃত্ব, গোয়েন্দা কার্যক্রম, অপরাধ তদন্ত এবং অপারেশনাল কমান্ডে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। দায়িত্ব ও সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব ক্ষেত্রে অধিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সম্প্রতি রাজধানীর রাজারবাগে বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্কের (বিপিডব্লিউএন) ২০২৪-২০২৭ কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বিষয়ক ঢাকা বিভাগীয় কর্মশালায় নারী নেতৃত্বের সম্প্রসারণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়।

কর্মশালায় বিপিডব্লিউএনের সাধারণ সম্পাদক ও অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশিক্ষণ-২) মোছা. শাহালা পারভীন সংগঠনের কৌশলগত পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। এতে নেতৃত্ব বিকাশ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, তদন্ত দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল পুলিশিংকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে সাইবার অপরাধ তদন্ত, সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতা, মানসিক সুস্থতা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিয়েও পৃথক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ইউএন উইমেনের বিশেষজ্ঞরা ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক পুলিশিং এবং ট্রমা-সচেতন তদন্ত পদ্ধতির ওপর কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।

একজন নারী উপপরিদর্শক বলেন, বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা এবং জটিল দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও নারী কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন। তাঁর মতে, অপারেশনাল নেতৃত্ব ও গোয়েন্দা কার্যক্রমে আরও বেশি সুযোগ সৃষ্টি হলে নারী সদস্যরা বাহিনীর কার্যক্রমে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের প্রতিনিধি এনরিকো লরেনজোন কর্মশালায় বলেন, নারী নেতৃত্ব বিকাশে গৃহীত কৌশল সফল করতে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার এবং নীতিগত সহায়তা অপরিহার্য। একই সঙ্গে ইউএন উইমেনের প্রতিনিধিরা নারী সদস্যদের দক্ষতা মূল্যায়ন করে প্রয়োজনভিত্তিক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ পুলিশের আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সাইবার অপরাধ মোকাবিলা, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সেবা এবং নেতৃত্বের বিভিন্ন পর্যায়ে নারীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো গেলে একটি আরও দক্ষ, আধুনিক ও জনবান্ধব পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আগামী দিনে নারী সদস্যদের অগ্রযাত্রা শুধু সংখ্যাগত বৃদ্ধি নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নেতৃত্ব ও পেশাগত উৎকর্ষের ক্ষেত্রেও আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন