রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬

ইউক্রেনের শপিং কমপ্লেক্সে রুশ ড্রোন হামলায় নিহত বেড়ে ১৬

ইউক্রেনের দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলের ক্রিভি রিহ শহরের একটি শপিং কমপ্লেক্সে রুশ ড্রোন হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১৩০ জন, যাদের মধ্যে ২৫ জন শিশু। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন দুই শিশুসহ নয়জন।

শনিবার (২২ আগস্ট) স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে। হামলাস্থলে এখনো অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চলছে।

ক্রিভি রিহ প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের প্রধান ওলেক্সান্দর ভিলকুল জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় শনিবার সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত আহতদের মধ্যে ৬১ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের মধ্যে ২৩ জনের অবস্থা গুরুতর।

নিহতদের স্মরণে রোববার ক্রিভি রিহ শহরে এক দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে।

শুক্রবার শহরটির সবচেয়ে বড় শপিং কমপ্লেক্সে রুশ ড্রোন হামলার পর সেখানে বড় ধরনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে বলে জানিয়েছিলেন ভিলকুল।

‘দুই দফায় হামলা’, অভিযোগ জেলেনস্কির

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ হামলাকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

তার দাবি, ড্রোন হামলাটি দুই দফায় চালানো হয়। প্রথম হামলা ও অগ্নিকাণ্ডের প্রায় আধা ঘণ্টা পর দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো হয় এবং সে সময় জরুরি উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে কাজ করছিলেন।

ক্রিভি রিহের শপিং কমপ্লেক্সে হামলার বিষয়ে রুশ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

কিয়েভেও হামলা, একজন নিহত

এর মধ্যেই শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে হামলার খবর পাওয়া গেছে।

কিয়েভ সিটি মিলিটারি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জানিয়েছে, রাজধানীর দারনিতস্কি জেলায় একটি গুদামে আগুন লাগে। এর প্রায় এক ঘণ্টা আগে শহরটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কতা জারি করা হয়েছিল।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় একজন নিহত এবং আরও একজন আহত হয়েছেন। সংশ্লিষ্ট জরুরি সেবার কর্মীরা ঘটনাস্থলে কাজ করছেন।

ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় রেলওয়ে প্রতিষ্ঠান ইউক্রজালিজনিতসিয়ার প্রধান নির্বাহী ওলেক্সান্দর পারৎসোভস্কি জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটির একটি স্থাপনায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় ওডেসা অঞ্চলের রোজদিলনা রেলস্টেশনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি জানান। তবে এতে রেল চলাচল ব্যাহত হয়নি এবং ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার কাজ চলছে।

ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর দাবি, রাতভর রাশিয়ার ছোড়া ২১৭টি ড্রোনের মধ্যে ১৮২টি ভূপাতিত করা হয়েছে। এ ছাড়া নয়টি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের দাবি করেছে তারা।

সামরিক পরিবহন অবকাঠামোয় হামলার দাবি মস্কোর

অন্যদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় পরিবহন অবকাঠামো এবং একটি লজিস্টিকস কেন্দ্র লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে তাদের বাহিনী।

মস্কোর দাবি, দারনিতসিয়া লোকোমোটিভ ডিপোতে হামলা চালানো হয়েছে। রাশিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে এমন লোকোমোটিভের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত করা হতো, যেগুলো ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনীর অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহৃত হয়।

কিয়েভ অঞ্চলের ব্রোভারির একটি লজিস্টিকস কেন্দ্রেও হামলা চালানোর দাবি করেছে রাশিয়া। পাশাপাশি ওডেসা অঞ্চলের চোরনোমর্স্ক ও পিভদেননি বন্দরে সামরিক সরঞ্জামের গুদাম ও জ্বালানি ট্যাংক লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে মস্কো।

এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

রাশিয়ায় ৪৫৭ ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি

একই রাতে রাশিয়ার ভূখণ্ডেও বড় ধরনের ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, দেশটির ১৫টি অঞ্চল এবং কৃষ্ণসাগর, আজভ সাগর ও রাশিয়ার অধিকৃত ক্রিমিয়ার আকাশে মোট ৪৫৭টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

রাশিয়ার সামারা অঞ্চলের গভর্নর ভিয়াচেস্লাভ ফেদোরিশচেভ জানিয়েছেন, অঞ্চলটি ‘ব্যাপক’ ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। হামলায় একটি শিল্প স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ওজোনের একটি লজিস্টিকস কমপ্লেক্সেও আঘাত লাগে।

রুশ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ওজোন তাদের লজিস্টিকস কমপ্লেক্সে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, গুদামে আগুন লাগার পর পাঁচ শতাধিক কর্মীকে সরিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। তবে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানানো হয়নি। গুদামটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।

রাশিয়ায় দুই শিশু নিহত

রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় ক্রাসনোদার অঞ্চলের গভর্নর ভেনিয়ামিন কনদ্রাতিয়েভ জানিয়েছেন, ইয়েস্কি জেলার বেসামরিক অবকাঠামো ও আবাসিক ভবন হামলার শিকার হয়েছে।

তার দাবি, এতে দুই শিশু নিহত এবং আরও দুইজন আহত হয়েছে। ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ জেলার প্রশাসনিক কেন্দ্রের একটি স্থাপনায় পড়লে সেখানে আগুন ধরে যায়।

অন্যদিকে ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ দাবি করেছে, সামারা অঞ্চলের নোভোকুইবিশেভস্ক তেল শোধনাগারে তারা হামলা চালিয়েছে এবং সেখানে আগুন লেগেছে। ইউক্রেনের দাবি, ওই শোধনাগারের উৎপাদিত জ্বালানি রুশ সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহৃত হয়।

পাল্টাপাল্টি হামলার তীব্রতা বাড়ছে

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়া ও ইউক্রেন পরস্পরের লজিস্টিকস কেন্দ্র, বন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো এবং পরিবহনসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা বাড়িয়েছে।

দুই পক্ষই ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। মস্কো ও কিয়েভ উভয়েরই দাবি, তাদের হামলার লক্ষ্য সামরিক স্থাপনা অথবা সামরিক কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো।

তবে ক্রিভি রিহের শপিং কমপ্লেক্সে হামলায় শিশুসহ বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনা নতুন করে যুদ্ধের মানবিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি সামনে এনেছে। একই রাতে দুই দেশের ভূখণ্ডে ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাল্টাপাল্টি দাবি সংঘাতের ক্রমবর্ধমান তীব্রতারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন