রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬

পর্তুগালে ‘বোরকা আইন’ কার্যকর, জনসমক্ষে মুখঢাকা পোশাকে নিষেধাজ্ঞা

পর্তুগালে জনসমক্ষে মুখ ঢেকে পরিচয় শনাক্তে বাধা সৃষ্টি করে—এমন পোশাক পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নতুন আইন অনুমোদন দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও জোসে সেগুরো। স্থানীয়ভাবে ‘বোরকা আইন’ নামে পরিচিত আইনটি কার্যকর হলে বোরকা বা নিকাবের মতো সম্পূর্ণ মুখঢাকা পোশাক জনসমক্ষে পরার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) প্রেসিডেন্ট সেগুরো আইনটিতে অনুমোদন দেন। এর আগে ১৭ জুলাই পর্তুগালের পার্লামেন্টে চূড়ান্ত ভোটে প্রস্তাবটি পাস হয়েছিল।

নতুন আইনের ভাষায় নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় পোশাকের নাম উল্লেখ করে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি। বরং জনসমক্ষে এমন পোশাক ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা মুখ আড়াল করে অথবা ব্যক্তির মুখ প্রদর্শন ও পরিচয় শনাক্তে বাধা সৃষ্টি করে।

আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দুই ধরনের জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। অসাবধানতাজনিত লঙ্ঘনের জন্য ১৫০ থেকে ৭৫০ ইউরো এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আইন ভাঙলে ৪০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ইউরো পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।

যেসব ক্ষেত্রে থাকছে ছাড়

নিষেধাজ্ঞাটি সব পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য হবে না। স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন, পেশাগত দায়িত্ব, শৈল্পিক কার্যক্রম এবং আবহাওয়াজনিত কারণে মুখ ঢাকার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া উপাসনালয়, কূটনৈতিক মিশন এবং উড়োজাহাজে অবস্থানের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞার ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।

আইনে অন্য কাউকে তার লিঙ্গ, ধর্ম, বয়স বা উৎসের কারণে মুখ ঢাকতে বাধ্য করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

কী বলছেন প্রেসিডেন্ট

আইনটিতে অনুমোদন দেওয়ার সময় বিষয়টিকে ‘অত্যন্ত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংবেদনশীল’ বলে উল্লেখ করেন প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও জোসে সেগুরো।

তার মতে, মানুষের পরিচয় ও পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে মুখ একটি মৌলিক উপাদান। সামাজিক সংহতি, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য প্রতিরোধ ও নিরাপত্তার যুক্তি এবং ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো বিবেচনায় নিয়ে আইনটিতে অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

নারীদের ক্ষেত্রেই শুধু সম্পূর্ণ মুখ ঢাকার বাধ্যবাধকতা তৈরি হলে তা নারী-পুরুষের সমতা ও সমমর্যাদার নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে—এমন যুক্তিও প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে উঠে আসে।

চেগার প্রস্তাব, সমর্থন ডানপন্থী দলগুলোর

আইনটির প্রাথমিক প্রস্তাব দিয়েছিল পর্তুগালের কট্টর ডানপন্থী দল চেগা। পরে প্রস্তাবটিতে সংশোধন আনা হয় এবং ধর্মীয় দিকের পরিবর্তে জননিরাপত্তা ও জনসমক্ষে ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করার বিষয়টিকে চূড়ান্ত আইনে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

১৭ জুলাই পার্লামেন্টের চূড়ান্ত ভোটে ক্ষমতাসীন সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (PSD), চেগা, ইনিসিয়াতিভা লিবারেল (IL) এবং CDS-PP আইনটির পক্ষে ভোট দেয়।

অন্যদিকে সোশ্যালিস্ট পার্টি (PS), লিভ্রে, পর্তুগিজ কমিউনিস্ট পার্টি (PCP), লেফট ব্লক (BE) ও JPP এর বিপক্ষে ভোট দেয়। PAN ভোটদানে বিরত ছিল।

কেন ‘বোরকা আইন’ নামে পরিচিত

আইনটির আনুষ্ঠানিক ভাষায় বোরকা বা নিকাবকে আলাদাভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি। এটি মূলত জনসমক্ষে পরিচয় শনাক্তে বাধা সৃষ্টি করে—এমন যেকোনো মুখঢাকা পোশাকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

তবে বোরকা ও নিকাব পরলে মুখের অধিকাংশ বা পুরো অংশ ঢাকা থাকে বলে আইনটি কার্যত এসব পোশাকের ব্যবহারকে প্রভাবিত করবে। এ কারণেই পর্তুগালের সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক আলোচনায় আইনটি ‘Lei das Burcas’ বা ‘বোরকা আইন’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।

আইন ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক

আইনটি নিয়ে পর্তুগালে কয়েক মাস ধরেই রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক চলছে। সমর্থকদের যুক্তি, জনসমক্ষে পরিচয় শনাক্ত করা, নিরাপত্তা, সামাজিক সংহতি এবং নারী-পুরুষের সমতার জন্য এ ধরনের বিধান প্রয়োজন।

অন্যদিকে বিরোধীরা বলছেন, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা ধর্মীয় ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং বিশেষভাবে মুসলিম নারীরা এর প্রভাবে পড়তে পারেন।

আইনটির প্রাথমিক প্রস্তাব নিয়ে সাংবিধানিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নও উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে সংশোধনের মাধ্যমে চূড়ান্ত আইনে ধর্মের পরিবর্তে জননিরাপত্তা ও পরিচয় শনাক্তকরণের বিষয়টিকে সামনে আনা হয়।

ইউরোপের আরও কয়েক দেশে রয়েছে বিধিনিষেধ

পর্তুগালই প্রথম ইউরোপীয় দেশ নয় যেখানে জনসমক্ষে মুখঢাকা পোশাক নিয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশে এরই মধ্যে পূর্ণ বা আংশিকভাবে মুখ ঢেকে রাখার ওপর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

পর্তুগালের নতুন আইনটি সেই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হলেও দেশটিতে এটি ধর্মীয় স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, জননিরাপত্তা এবং নারীর অধিকারের ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।

সূত্র: পর্তুগিজ পার্লামেন্ট, পর্তুগিজ প্রেসিডেন্সি, RTP, EFE ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন