রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬

ইরাকি তেলবাহী ট্যাংকারকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার বিশেষ অনুমতি দিল ইরান

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাপকভাবে সীমিত থাকার মধ্যেই ইরাকের কয়েকটি তেলবাহী ট্যাংকারকে বিশেষ অনুমতিতে প্রণালি অতিক্রমের সুযোগ দিয়েছে ইরান। বাগদাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কূটনৈতিক চ্যানেলে বারবার অনুরোধের পর তেহরান এ অনুমতি দিয়েছে বলে শনিবার (২২ আগস্ট) জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ।

তবে ইরাকি ট্যাংকারকে বিশেষ অনুমতি দেওয়ার অর্থ হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিকভাবে খুলে দেওয়া নয়। চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথে জাহাজ চলাচল এখনো যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক কম। অনুমোদনহীন তেলবাহী জাহাজের চলাচলেও ঝুঁকি রয়ে গেছে।

বাগদাদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল বিশেষ অনুমতি

আইআরএনএর বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফের ইরাক সফরের সময় বাগদাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুরোধ ছিল ইরাকি তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের বিশেষ অনুমতি দেওয়া।

শনিবার ইরাকি প্রেসিডেন্ট নিজার আমেদি জানান, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান ইরাকি তেল বহনকারী কয়েকটি জাহাজের হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের পথ সহজ করেছে। ইরাকের তেল হরমুজ দিয়ে রপ্তানির বিষয়টি নিয়েও বাগদাদ ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। তবে পুরো বিষয়টি এখনো জটিল বলে বাগদাদ ডায়ালগ পলিসি কনফারেন্সে মন্তব্য করেন তিনি।

ইরানের সিদ্ধান্তটি ইরাকের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হরমুজে চলাচল সীমিত হওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি ইরাক। সংঘাত শুরুর আগে দেশটি দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করত।

হরমুজে তেল পরিবহন ২ কোটির বেশি থেকে ৮০ লাখ ব্যারেলে

হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন কর্মকর্তাদের হিসাবে, যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ২ কোটির বেশি ব্যারেল তেল এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো—যা বিশ্বে ব্যবহৃত প্রতি পাঁচ ব্যারেল তেলের প্রায় এক ব্যারেলের সমান।

বর্তমানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সহায়তায় সাত দিনের গড় হিসাবে দৈনিক প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ দিয়ে পরিবহন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট। অর্থাৎ যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় তেল পরিবহনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

জাহাজ চলাচল কতটা সীমিত হয়ে পড়েছে, তার একটি চিত্রও পাওয়া গেছে সাম্প্রতিক শিপ-ট্র্যাকিং তথ্যে। বৃহস্পতিবার মাত্র চারটি পণ্যবাহী জাহাজ প্রণালির নির্ধারিত পথ দিয়ে চলেছে; এর কোনোটিই বড় অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার বা এলএনজি ট্যাংকার ছিল না।

হরমুজ পুরোপুরি খুলছে না ইরান

ইরানের অবস্থান অনুযায়ী, ইরাকি ট্যাংকারকে বিশেষ অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

চলতি মাসের শুরুতেই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি যুদ্ধের আগের অবস্থায় আর ফিরে যাবে না। নিরাপদ নৌচলাচলের জন্য ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি নতুন কাঠামো তৈরির বিষয়ে আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য নতুন নৌপথ বর্তমান উত্তর বা দক্ষিণ রুটের পরিবর্তে আলাদা একটি রুট হতে পারে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।

এর আগে জুলাইয়ে ইরানের পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ (পিজিএসএ) জানিয়েছিল, হরমুজ দিয়ে চলাচলের জন্য জাহাজগুলোকে অনুমতি নিতে হবে এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় আবেদন পর্যালোচনা করে অনুমোদন দেওয়া হবে।

ফলে ইরাকি জাহাজগুলোর জন্য দেওয়া অনুমতি মূলত একটি বিশেষ ছাড়, সাধারণভাবে আন্তর্জাতিক তেলবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার ঘোষণা নয়।

বিকল্প তেল রপ্তানি পথ খুঁজছে বাগদাদ

হরমুজের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি কমাতে বিকল্প পথে তেল রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনাও করছে ইরাক।

ইরাকি প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি শুক্রবার জানান, তুরস্কের জেইহান (Ceyhan) বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি সম্প্রসারণের পাশাপাশি সিরিয়ার বানিয়াস বন্দর এবং জর্ডানের আকাবা বন্দর ব্যবহার করে তেল রপ্তানি শুরুর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বাগদাদ।

হরমুজে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা বা সীমিত নৌচলাচল অব্যাহত থাকলে এসব বিকল্প রুট ইরাকের তেল রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ

পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে হরমুজ প্রণালি। ইরাকসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের বড় তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানির অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার এটি।

চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজে স্বাভাবিক নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ায় শুধু ইরাক নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের বাজারও চাপের মুখে পড়েছে। তেহরানের বিশেষ অনুমতিতে ইরাকি ট্যাংকার চলাচল শুরু হওয়া বাগদাদের জন্য স্বস্তির খবর হলেও প্রণালিটির সামগ্রিক সংকট এখনো কাটেনি।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা, হরমুজে সীমিত জাহাজ চলাচল এবং একই সঙ্গে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোকে বাছাই করে বিশেষ অনুমতি দেওয়ার ঘটনা—সব মিলিয়ে কৌশলগত এ জলপথের নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা এখন মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও ভূরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

সূত্র: ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন