অনুসরণ করুন:
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের ফোনে আড়িপাতা, চিফ অব স্টাফ গ্রেপ্তার

রাষ্ট্রদ্রোহের তদন্তে সাবেক পুলিশপ্রধানসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা; ঘটনাকে প্রাবোও-জোকোই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর ফোনালাপে অবৈধভাবে আড়িপাতার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহের তদন্ত শুরু করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ লিসতিও সিগিত প্রাবোওসহ পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার লিসতিও ও পুলিশের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে চিফ অব স্টাফের পদ থেকেও তাঁকে বরখাস্ত করা হয়।তবে নামের মিল থাকলেও লিসতিওর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট প্রাবোওর কোনো পারিবারিক সম্পর্ক নেই। বিশ্লেষকদের অনেকে এ ঘটনাকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো (জোকোই) ও বর্তমান প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক দূরত্বের প্রকাশ হিসেবে দেখছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জোকোইয়ের সরাসরি সমর্থনে জয়ী হয়েছিলেন প্রাবোও।যেভাবে ফাঁস হলো আড়িপাতার ঘটনাআইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, এক পুলিশ কর্মকর্তার তথ্যের ভিত্তিতে গত সপ্তাহে অবৈধ নজরদারির বিষয়টি সামনে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো পরোয়ানা বা আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন ছাড়াই পুলিশের বিশেষ নজরদারি ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের ফোন নম্বর যুক্ত করা হয়েছিল।লিসতিও যখন জাতীয় পুলিশপ্রধান ছিলেন, অর্থাৎ ২০২৫ সাল থেকেই এ আড়িপাতা চলছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। বুধবার প্রেসিডেন্টের এক মুখপাত্র জানান, এ ঘটনায় এমন স্পর্শকাতর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এ কারণে ঘটনাটিকে রাষ্ট্রদ্রোহের পর্যায়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।ইন্দোনেশিয়ায় রাষ্ট্রদ্রোহের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা মৃত্যুদণ্ড। তবে গত এক দশকে দেশটিতে কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি। আড়িপাতার মূল উদ্দেশ্য বা কারণ এখনো স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র।আরও যাঁদের ফোনে নজরদারির অভিযোগকর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু প্রেসিডেন্টের ফোনেই নয়, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, এনজিও প্রতিনিধি এবং শীর্ষ ব্যবসায়ীদের ফোনেও নজরদারি চালানো হয়েছিল।বৃহস্পতিবার রাতে অপরাধ তদন্ত ইউনিটের কর্মকর্তা সালামেত উলিয়ান্তিকে এ মামলার চতুর্থ সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ থাকায় তাঁকে আটক করা হয়নি।আগেও আড়িপাতার ঘটনা ঘটেছেইন্দোনেশিয়ার শীর্ষ নেতাদের ঘিরে আড়িপাতার অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। ২০১৪ সালে জাকার্তার গভর্নর থাকাকালে জোকো উইদোদোর সরকারি বাসভবনে একাধিক আড়িপাতার যন্ত্র পাওয়া গিয়েছিল।এ ছাড়া সাবেক প্রেসিডেন্ট মেঘবতী সুকর্ণপুত্রী ২০২৪ সালে দাবি করেছিলেন, নজরদারির আশঙ্কায় তিনি নিজের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছিলেন।প্রাবোও-জোকোই সম্পর্কে দূরত্বের ইঙ্গিতসিঙ্গাপুরের আইএসইএএস-ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের গবেষক মেদে সুপ্রিয়াতমা বিবিসি ইন্দোনেশিয়াকে বলেন, লিসতিও সাবেক প্রেসিডেন্ট জোকোইয়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাঁর গ্রেপ্তার দুই পক্ষের পথ আলাদা হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।তবে ইন্দোনেশিয়ার পুলিশপ্রধান সুয়ুদি আরিও সেতো দাবি করেছেন, লিসতিওর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ পুরোপুরি আইন প্রয়োগের অংশ। এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বা রেষারেষির সম্পর্ক নেই।২০২৪ সালের নির্বাচনে জোকোইয়ের সমর্থনে প্রাবোও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে জোকোইয়ের বড় ছেলে জিবরান রাকাবুমিং রাকা ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। তবে ক্ষমতায় আসার পর দুই বছরের মধ্যে তাঁদের রাজনৈতিক সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।জোকোইয়ের স্বপ্নের নতুন রাজধানী নুসান্তারা নির্মাণ প্রকল্পে প্রাবোও তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে খাবার দেওয়ার কর্মসূচিতে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করছেন তিনি। প্রশাসনে একাধিক রদবদলের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অর্থমন্ত্রী শ্রী মুলিয়ানি ইন্দ্রাবতীসহ জোকোইয়ের ঘনিষ্ঠ অনেক কর্মকর্তাকে নতুন দায়িত্বে সরিয়ে দিয়েছেন।এদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জিবরানের হাইস্কুলের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ নিয়েও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। যোগ্যতার প্রশ্ন তুলে তাঁকে পদচ্যুত করার দাবিও উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে জোকোইয়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত লিসতিওর গ্রেপ্তার দুই পক্ষের উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।বৃহস্পতিবার আদালতের শুনানি শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জোকোই বলেন, চলমান আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি সবার শ্রদ্ধা থাকা উচিত।বহুমুখী সংকটে প্রাবোও সরকারএমন এক সময়ে আড়িপাতার কেলেঙ্কারি সামনে এসেছে, যখন প্রাবোও সরকার বিভিন্ন সংকটের মুখে রয়েছে। স্কুলে বিনামূল্যে খাবার বিতরণ কর্মসূচি তহবিল সংকটে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের ক্ষয়ক্ষতি সামলাতে হয়েছে দেশটিকে। পাশাপাশি কারসাজির অভিযোগে জাতীয় শেয়ারবাজারেও বড় সংকট দেখা দিয়েছে।জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, দাবানলের বিষাক্ত ধোঁয়াশা ও দুর্নীতির প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ বিক্ষোভ করছেন।জাকার্তার সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) গবেষক নিকি ফাহরিজাল বিবিসি ইন্দোনেশিয়াকে বলেন, দেশটি যেন চালকহীন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় চলছে। সরকারের কার্যক্রমে সাধারণ মানুষের স্বার্থের চেয়ে বিশেষ মহলের স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন