উত্তর কোরীয় হ্যাকারদের হামলার দাবি বাইন্যান্সের, চুরি হওয়া সম্পদের ৯৮ শতাংশ পুনরুদ্ধারের কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি
বিশ্বের শীর্ষ ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্সে ৬৩৪ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ চুরির ঘটনায় নতুন তথ্য প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বাইন্যান্সের দাবি, এ হামলার পেছনে ছিল উত্তর কোরিয়ার একটি হ্যাকার দল, যার সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। কয়েক মাস ধরে পরিকল্পিত এ সাইবার অভিযানে ভুয়া চাকরির প্রস্তাব, ছদ্মবেশী নিয়োগ প্রতিনিধি এবং ক্ষতিকর সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছিল।
বাইন্যান্সের বিবৃতি অনুযায়ী, গত ২৯ অক্টোবরের হামলাটি আকস্মিক ছিল না। বরং জুন থেকে শুরু হওয়া একাধিক ধাপের মাধ্যমে হ্যাকাররা প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীদের সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করে এবং শেষ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় প্রবেশের সুযোগ পায়।
আক্রমণের শুরু একটি সফটওয়্যার ডাউনলোড থেকে
বাইন্যান্স জানায়, এ বছরের জুনে তাদের ওয়ালেট অবকাঠামোয় কর্মরত এক প্রকৌশলী সার্চ ইঞ্জিনে জনপ্রিয় একটি এআই কোডিং টুল খুঁজতে গিয়ে অসাবধানতাবশত ‘হোমব্রু’ নামের একটি ইনস্টলেশন ফাইল ডাউনলোড করেন। ফাইলটি ছিল হ্যাকিংয়ের শিকার।
প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তাব্যবস্থা তখনই কিছু অসংগতি শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়। তবে তার আগেই ওই প্রকৌশলীসহ কয়েকজন সহকর্মীর সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য হ্যাকারদের হাতে চলে যায় বলে দাবি করেছে বাইন্যান্স।
ভুয়া চাকরির প্রস্তাবে প্রকৌশলীকে ফাঁদে ফেলা
হামলার দ্বিতীয় ধাপে সেপ্টেম্বরে বাইন্যান্সের আরেক সফটওয়্যার প্রকৌশলীকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। একটি চাকরি খোঁজার প্ল্যাটফর্মে ভুয়া ‘প্রজেক্ট ডিরেক্টর’ পরিচয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে হ্যাকাররা। চাকরির প্রস্তাবে আগ্রহী হয়ে ওই প্রকৌশলী দুই ধাপের সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে রাজি হন।
প্রথম ধাপে একজন ছদ্মবেশী মানবসম্পদ বিভাগের প্রতিনিধির সঙ্গে সরাসরি ভিডিও কলে কথা বলেন তিনি। আস্থা অর্জনের জন্য ওই ব্যক্তি নিজের একটি ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টও শেয়ার করেন।
দ্বিতীয় ধাপে একটি চ্যাটিং অ্যাপের মাধ্যমে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে চূড়ান্ত সাক্ষাৎকার হয়। ওই ভুয়া সিইও প্রকৌশলীকে একটি কাজের ফাইল পাঠান। ফাইলটি কম্পিউটারে ইনস্টল বা সেটআপ করার সঙ্গে সঙ্গেই এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা ম্যালওয়্যার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
নিরাপত্তাব্যবস্থার চোখ ফাঁকি দিতে বিশেষ কৌশল
বাইন্যান্সের ভাষ্য অনুযায়ী, ম্যালওয়্যারটি নিরাপত্তা সতর্কতা ও শনাক্তকরণ এড়াতে জটিল কৌশল ব্যবহার করেছিল। সাইবার অপরাধীরা সিস্টেমে থাকা একটি আসল ডেভেলপমেন্ট টুল সরিয়ে তার জায়গায় ক্ষতিকর সংস্করণ বসিয়ে দেয়।
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ম্যালওয়্যারটি গোপনে নিজের কার্যক্রম চালাত এবং কাজ শেষ হলে সিস্টেমে হ্যাকিংয়ের চিহ্ন হিসেবে থাকা ডিজিটাল আলামত স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে ফেলত। ফলে হামলাটি শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
অভ্যন্তরীণ এআই টুল ব্যবহার করে হামলার বিস্তার
বাইন্যান্সের বিবৃতিতে বলা হয়, ২০ অক্টোবর হ্যাকাররা ওই প্রকৌশলীর হ্যাক হওয়া কম্পিউটার ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ এআই টুলে প্রবেশ করে। এর মাধ্যমে তারা প্রথম প্রকৌশলী ও তাঁর আরেক সহকর্মীর কম্পিউটারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়।
এরপর ২৯ অক্টোবর হ্যাকাররা তৃতীয় এক প্রকৌশলীর কম্পিউটারে প্রবেশ করে। প্রথম ওয়ালেট প্রকৌশলীর কাছ থেকে চুরি করা গোপন তথ্য ব্যবহার করে সেখানে ক্ষতিকর স্ক্রিপ্ট সক্রিয় করা হয়। বাইন্যান্সের দাবি, এভাবেই বড় ধরনের সাইবার হামলা চালিয়ে ডিজিটাল সম্পদ চুরি করা হয়।
ঘটনাটি ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের সাইবার নিরাপত্তা, কর্মীদের ডিভাইস সুরক্ষা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিচয় যাচাইয়ের দুর্বলতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
২৮৫ কোটি ডলারের সম্পদ ফ্রিজ, ক্ষতি বহনের ঘোষণা
বাইন্যান্স জানিয়েছে, চুরি হওয়া ৬৩৪ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদের মধ্যে প্রায় ২৮৫ কোটি ডলারের সম্পদ ফ্রিজ করতে পেরেছে তারা। তবে গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলন সাময়িকভাবে স্থগিত করার পরও কিছু সম্পদের লেনদেন বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। কারণ, ওই লেনদেনগুলো হামলার শুরুতেই অনুমোদিত হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ৩ নভেম্বরের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ওয়ালেট ব্যবস্থা ও অভ্যন্তরীণ এআই টুলগুলো নতুন করে চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি, হামলার শিকার ডিভাইসগুলো বদলে ফেলা, হ্যাক হওয়া পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য ও টোকেন বাতিল এবং কর্মীদের সব ডিভাইসে উন্নত নিরাপত্তা পরীক্ষা চালানো হয়েছে।
ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা শনাক্ত করতে পুরো প্রতিষ্ঠানে এআইচালিত অসংগতি শনাক্তকরণ প্রযুক্তিও যুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাইন্যান্স।
ক্ষতির দায় নেবে বাইন্যান্স
বাইন্যান্স বলেছে, সাইবার হামলায় হওয়া সম্পূর্ণ আর্থিক ক্ষতির দায় প্রতিষ্ঠানটি নিজেরাই বহন করবে। চুরি হওয়া অর্থের সমপরিমাণ তহবিলও আলাদা করে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, চুরি হওয়া টোকেন সম্পদের ৯৮ শতাংশ ইতিমধ্যে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। অবশিষ্ট সম্পদ বাজার থেকে পুনরায় কিনে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

