তদন্তে পাওয়া তথ্য যাচাই ও অপর আসামির বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ; সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিল তদন্ত সংস্থা।
বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় করা হত্যা মামলায় তাসনিম দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলামের আদালত তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন।
প্রসিকিউশন পুলিশের এসআই সাইফুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন। এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।
রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। অন্যদিকে, আসামির আইনজীবী ইমাম হোসেন জাবেদ রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনে যেসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়, এর আগে চার দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় দিশা তদন্তসংশ্লিষ্ট কিছু তথ্য দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার আগের দিন ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফ সাউরির সঙ্গে উত্তরার ‘নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’ গিয়েছিলেন তিনি। একই দিন সন্ধ্যায় তাঁরা একাধিকবার সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকসেও যান। এ ছাড়া তাহসিফের সঙ্গে একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজে যাওয়ার তথ্যও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, দিশা তাহসিফের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে মোটরসাইকেলে ঘোরাঘুরি এবং রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে থাকার কথা জানিয়েছেন। তাঁর দেওয়া আরও কিছু তথ্য তদন্তের স্বার্থে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আবেদনে আরও বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদের সময় দিশা কিছু প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছেন এবং নীরব থেকেছেন বলে তদন্ত কর্মকর্তার অভিযোগ।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, মামলার আরেক সন্দেহভাজন আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ পুলিশ হেফাজতে রিমান্ডে রয়েছেন। দিশা ও দীপের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা এবং তাহসিফের মোবাইল ফোনের কললিস্টে পাওয়া যোগাযোগের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আরও জিজ্ঞাসাবাদ দরকার বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা সাতটি কারণ
তদন্ত কর্মকর্তা দিশাকে পুনরায় রিমান্ডে নেওয়ার পক্ষে সাতটি কারণ তুলে ধরেন। সেগুলো হলো—
১. ঘটনার দিন উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রুআপ কমপ্লেক্সে সিপি ফাইভ স্টার ফাস্ট ফুডের দোকানে তাহসিফ ও দিশার মধ্যে আবেগপ্রবণ কথাবার্তা বা বাকবিতণ্ডা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা।
২. ঘটনার দিন ‘নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’ তাঁদের মধ্যে কোনো কথাকাটাকাটি বা বিরোধ হয়েছিল কি না, তা অনুসন্ধান করা।
৩. ঘটনার দিন বা এর আগে তাঁদের সম্পর্কে কোনো টানাপোড়েন চলছিল কি না, তা যাচাই করা।
৪. মামলার ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করা।
৫. অজ্ঞাতনামা অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা।
৬. ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলামত উদ্ধার করা।
৭. দিশা ও দীপের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা।
তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার ও মামলার অগ্রগতি
তাহসিফ সাউরির ভাসমান মরদেহ গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণকারী হিসেবে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় দীপের ডাকে তাহসিফ বাসার নিচে নেমে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন। দীপ পরে জানিয়েছিলেন, তাঁরা একসঙ্গে রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খাওয়ার পর উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকায় আলাদা হয়ে যান।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হওয়ার আগে দীপকে ৩০ অক্টোবর রাতে নৌ-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই রাতে তাহসিফের বাবা মামলা করার পর তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরদিন আদালত দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। চার দিনের রিমান্ড শেষে বুধবার তাঁকে আরও তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়।
তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার
দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩০ অক্টোবর সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই এলাকায় মধ্যরাতে তাহসিফের সঙ্গে যাওয়ার কথাও স্বীকার করেছিলেন দীপ বলে জানা গেছে। পরে পিবিআই কর্মকর্তারা তাঁকে নিয়ে টঙ্গীর ওই এলাকা পরিদর্শন করেন।
এদিকে, তাসনিম দিশাকে রাজধানীর কাফরুল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে প্রতিবেদনের একাংশে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গ্রেপ্তারের তারিখ নিয়ে বর্ণনায় অসংগতি রয়েছে। তদন্তের স্বার্থে দিশা ও দীপের বক্তব্য যাচাই এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করার বিষয়টি এখন গুরুত্ব পাচ্ছে।

