বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

সাভার-আশুলিয়ায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে আহত অর্ধশতাধিক, ছুটি শতাধিক কারখানায়

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ, শতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যে সাভারের হেমায়েতপুর, উলাইল ও আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) সকাল থেকে চলা সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় পুলিশ, শ্রমিক, সাংবাদিক ও পথচারীসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের শতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

হেমায়েতপুরে সংঘর্ষ, পুলিশের গাড়িতে আগুন

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুধবার সকালে শ্রমিকেরা কারখানায় প্রবেশ করে কার্ড পাঞ্চের মাধ্যমে হাজিরা নিশ্চিত করেন। পরে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তাঁরা কারখানা থেকে বেরিয়ে হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড় এলাকায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।

একপর্যায়ে শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নিলে পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছোড়ে।

সংঘর্ষের মধ্যে শ্রমিকেরা পুলিশের একটি গাড়ি ও একটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেন বলে জানা গেছে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শ্রমিকেরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে পদ্মার মোড়, হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন।

হেমায়েতপুরের সিঙ্গাইর সড়কের বিভিন্ন স্থানে কাঠের টুকরা ফেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে শ্রমিকদের একটি অংশ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সড়ক অবরোধ করে। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। যানবাহন আটকে পড়ায় ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রী ও সাধারণ মানুষ।

উলাইল ও নিশ্চিন্তপুরেও সংঘর্ষ

একই সময়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উলাইল এলাকায় শ্রমিকেরা মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করলে শ্রমিকেরাও পাল্টা ইটপাটকেল ছোড়েন।

সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সময় বিভিন্ন স্থানে হেলমেট ও মুখোশ পরা, লাঠি হাতে একদল লোককে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে দেখা যায়। তাঁরা শ্রমিক নাকি বহিরাগত, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, বুধবার সকাল থেকেই আশুলিয়ার নরসিংহপুর ও নিশ্চিন্তপুর এলাকার বিভিন্ন কারখানার ভেতরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছিলেন শ্রমিকেরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাঁরা দাবি আদায়ের জন্য সড়কে নামার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়।

এ সময় আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের কারণে ওই সড়কে কিছু সময়ের জন্য সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ ছিল। ঘটনাস্থল থেকে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে মবিন নামের একজনকে আটক করে পুলিশ।

আহত অর্ধশতাধিক, স্বাভাবিক হয়েছে যান চলাচল

সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোশাররফ হোসেন জানান, শ্রমিকদের হামলায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলমসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এ ছাড়া শ্রমিক, সাংবাদিক ও পথচারীসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

বেলা সাড়ে ৩টার দিকে তিনি জানান, পুলিশের তৎপরতায় সাভারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে এবং যান চলাচল শুরু হয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিভিন্ন কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। পুরো এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রাখা হয়েছে।

নিরাপত্তায় বিজিবির তিন প্লাটুন

সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। সাভারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তায় বিজিবির তিন প্লাটুন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নয়জন।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনেক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে মোট কতটি কারখানায় ছুটি বা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, সে তথ্য তাঁর কাছে নেই।

বিজিবি-৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তৈয়মুর হাসান খান জানান, পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে বিজিবি।

তিনি বলেন, আন্দোলনের নামে যাতে অরাজকতা সৃষ্টি বা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

কারখানার সামনে বিএনপি নেতাকর্মীদের অবস্থান

এদিকে বহিরাগত ও নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের প্রতিহত করার কথা বলে সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নসহ আশপাশের বিভিন্ন কারখানার সামনে অবস্থান নিয়েছেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।

তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আজিজ দাবি করেন, আন্দোলন ও ভাঙচুরে জড়িত সবাই প্রকৃত শ্রমিক নন। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শ্রমিক পরিচয়ে কারখানায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সড়ক অবরোধ করছেন। পাশের সিঙ্গাইর ও হেমায়েতপুর থেকেও লোকজন এসে শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গ্রেপ্তার শ্রমিকদের মুক্তি দাবি শ্রমিক নেতার

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বুধবার বিকেলে জানান, সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। আশুলিয়ার অধিকাংশ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং শ্রমিকেরা নিরাপদে বাড়ি ফিরেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের গ্রেপ্তার, মামলা ও হামলার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দ্রুত নিঃশর্ত মুক্তির দাবিও জানান তিনি।

কারখানা ও সড়কে বিশৃঙ্খলার বিষয়ে মিন্টুর অভিযোগ, বহিরাগতরা সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে হামলা ও অরাজকতা সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে শ্রম আইনের প্রথম বৈঠক সফল হয়েছে উল্লেখ করে আন্দোলনরত শ্রমিকদের কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলায় না জড়িয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বাড়ি ফেরার আহ্বান জানান তিনি।

শতাধিক কারখানায় ছুটি, পরিস্থিতি স্বাভাবিকের দাবি

শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, আশুলিয়ায় শ্রমিকদের সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। সাভারেও শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও পরে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল মিলিয়ে শতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন