হাওরাঞ্চল স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সমন্বিত উদ্যোগের আওতায়। উন্নয়ন কার্যক্রমে সহযোগিতার আশ্বাস ফ্রেন্ডশিপের
জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এমপির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন রামন ম্যাগসেসে পুরস্কার-২০২৬ প্রাপ্ত ও বিশিষ্ট সমাজকর্মী, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রুনা খান। সাক্ষাৎকালে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের জীবনমান উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বুধবার (৪ নভেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে ডেপুটি স্পিকারের কার্যালয়ে এ সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।
রুনা খানকে অভিনন্দন ডেপুটি স্পিকারের
সাক্ষাৎকালে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এমপি রামন ম্যাগসেসে পুরস্কার অর্জন করায় রুনা খানকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, “আপনি আমাদের দেশের সম্পদ, আমাদের ভবিষ্যৎ।”
তিনি বলেন, রুনা খানের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের জন্য গৌরবের। দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা প্রশংসনীয়। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবিকার উন্নয়নে ফ্রেন্ডশিপের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন
আলোচনায় নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ উঠে আসে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার অভাব, শিক্ষার সীমিত সুযোগ এবং কর্মসংস্থানের সংকটের কারণে এ অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, হাওরাঞ্চলের মানুষ একসময় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকলেও বর্তমানে জীবিকার প্রয়োজনে অনেককে নিজ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র যেতে হচ্ছে। কেউ কেউ শহরে গিয়ে রিকশা চালানোসহ বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।
তিনি মনে করেন, হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, যোগাযোগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই উন্নয়নের পথ তৈরি করা সম্ভব।
স্যাটেলাইট হাসপাতাল ও ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সের প্রয়োজনীয়তা
হাওরাঞ্চলের দুর্গমতা বিবেচনায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। ডেপুটি স্পিকার বলেন, প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য সহজলভ্য ও দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্যাটেলাইট হাসপাতাল এবং ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সের মতো উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্ষা মৌসুমে হাওরাঞ্চলের অনেক এলাকা পানিতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এ সময় জরুরি রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। ফলে নৌপথে দ্রুত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
তিনি বলেন, দুর্গম এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
হাওরাঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়েও আলোচনা হয়। ডেপুটি স্পিকার বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো গেলে মানুষের অন্যত্র গিয়ে জীবিকা নির্বাহের চাপ কমবে।
হাওরাঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। তবে এসব উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন কার্যক্রম এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি তাদের নিজস্ব এলাকায় টেকসই জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
জলাশয় ব্যবস্থাপনা ও জেলেদের অধিকার
হাওরাঞ্চলের জলাশয় ব্যবস্থাপনা এবং মৎস্যসম্পদের ওপর স্থানীয় মানুষের অধিকার নিয়েও আলোচনা হয়।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, জলাশয় ব্যবস্থাপনায় প্রভাবশালী ইজারাদারদের নিয়ন্ত্রণের কারণে অনেক সাধারণ জেলে মাছ ধরার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় জেলেদের অধিকার সংরক্ষণ এবং জলাশয়ের সম্পদ ব্যবহারে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, জলাশয় ব্যবস্থাপনায় এমন ব্যবস্থা থাকা উচিত, যাতে সাধারণ জেলেরা জীবিকা নির্বাহের সুযোগ পান এবং একই সঙ্গে মৎস্যসম্পদ ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে।
শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে গুরুত্ব
হাওরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও সাক্ষাৎকালে আলোচনা হয়। ডেপুটি স্পিকার জানান, দুর্গম এলাকার অনেক শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের দুই থেকে তিন মাইল পথ পাড়ি দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়।
এ ধরনের বাস্তবতা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি বলেন, হাওরাঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত সহজ করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সমন্বিত উন্নয়নে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব
হাওরাঞ্চলের উন্নয়ন কার্যক্রম কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন ডেপুটি স্পিকার।
তিনি বলেন, মৎস্য, কৃষি, জীববৈচিত্র্য, পর্যটন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের নিয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে।
এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে হাওরাঞ্চলের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, স্থানীয় জনগণের অধিকার সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ফ্রেন্ডশিপের সহযোগিতার আশ্বাস
সাক্ষাৎকালে রুনা খান হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ফ্রেন্ডশিপের কার্যক্রম ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি ডেপুটি স্পিকারের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, দুর্গম এলাকার মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও জীবিকার উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
রুনা খান হাওরাঞ্চলের উন্নয়ন কার্যক্রমে ফ্রেন্ডশিপের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয়ের আশ্বাস দেন।
সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সাক্ষাৎ
সাক্ষাৎটি সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
সাক্ষাৎকালে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সহযোগিতা ও কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।

