দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু; কারও ওয়ার্ক পারমিট বাতিল, ঋণের কিস্তি ও পরিবারের খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় শ্রমিকেরা
সিঙ্গাপুরে দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৪০ জন অভিবাসী শ্রমিক বেতন না পেয়ে ও কাজ হারিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। তাঁদের বড় একটি অংশ বাংলাদেশের নাগরিক। এ ঘটনায় ‘প্রসেস মেইনটেন্যান্স সলিউশনস’ ও ‘জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দেশটির জনশক্তি মন্ত্রণালয় (এমওএম)।
বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুরের সংবাদমাধ্যম দ্য স্ট্রেইটস টাইমস-এর প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়েছে, গত দুই থেকে তিন মাস ধরে প্রতিষ্ঠান দুটির অনেক শ্রমিক বেতন পাচ্ছেন না। এর মধ্যে কয়েকজনের ওয়ার্ক পারমিটও বাতিল করা হয়েছে।
ঋণের বোঝা, দেশে পরিবারের খরচ
২৪ বছর বয়সি বাংলাদেশি শ্রমিক হোসেন মৃদুল ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সিঙ্গাপুরে যান। ওভারটাইমসহ মাসে ৬০০ সিঙ্গাপুরি ডলার আয় করতেন তিনি। আয়ের প্রায় পুরোটাই দেশে পাঠাতেন। এর অর্ধেক খরচ হতো সিঙ্গাপুরে আসার জন্য নেওয়া ৯ হাজার ডলারের ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধে। বাকি অর্থ দিয়ে পাবনায় থাকা ছয় সদস্যের পরিবারের খরচ চলত।
কিন্তু গত দুই মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না মৃদুল। এর মধ্যে চলতি মাসের শুরুতে তাঁর ওয়ার্ক পারমিটও বাতিল করা হয়েছে। অথচ পারমিটটির মেয়াদ ছিল ২০২৭ সালের জুলাই পর্যন্ত।
মৃদুল বলেন, “আমার পরিবারের অবস্থা ভালো না বলেই আমি সিঙ্গাপুরে এসেছিলাম। এখন কাজও নেই, বেতনও নেই। পরিবার কীভাবে বাঁচবে, তা নিয়ে আমি খুব আতঙ্কে আছি।”
একই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন ‘জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’-এর ২১ বছর বয়সি বাংলাদেশি শ্রমিক সায়মন ইসলাম। তাঁর প্রায় ১ হাজার ৮০০ সিঙ্গাপুরি ডলার বেতন বকেয়া রয়েছে। তবে সেই অর্থ পুরোপুরি ফেরত পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন তিনি।
শ্রমিকদের কয়েকজন জানান, সিঙ্গাপুরের প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে কাজ পাওয়ার জন্য বাংলাদেশে থাকতে দালালদের ১২ হাজার ডলারেরও বেশি দিয়েছেন তাঁরা। এ খাতের আওতায় জুরং আইল্যান্ডের মতো শিল্পাঞ্চলে বিভিন্ন কারখানা ও স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করেন শ্রমিকেরা।
তাঁদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এক বছর কাজ করার পর সিঙ্গাপুরের নির্মাণ খাতে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেশন কোর্সে পাঠানো হবে। কিন্তু প্রায় কাউকেই সেই প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন শ্রমিকেরা।
নির্মাণ খাতে যাওয়ার আগ্রহ, আয়ের ব্যবধানও একটি কারণ
প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত থেকে নির্মাণ খাতে যেতে আগ্রহী অনেক শ্রমিক। তাঁদের মতে, নির্মাণ খাতে আয় তুলনামূলক বেশি।
গত আগস্টে সিঙ্গাপুরে অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ‘ট্রানজিয়েন্ট ওয়ার্কার্স কাউন্ট টু’-এর এক জরিপে দেখা যায়, প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে গড় মাসিক আয় ৭৭১ সিঙ্গাপুরি ডলার। নির্মাণ খাতে এ আয় ৮৬৮ ডলার।
তদন্তের পাশাপাশি শ্রমিকদের সহায়তা দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ
সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয় (এমওএম) শনিবার এক বিবৃতিতে জানায়, ‘প্রসেস মেইনটেন্যান্স সলিউশনস’ ও ‘জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’-এর বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।
বকেয়া বেতনের দাবিতে ‘ট্রাইপার্টাইট অ্যালায়েন্স ফর ডিসপিউট ম্যানেজমেন্টে’ (টিএডিএম) অভিযোগ করা শ্রমিকদের সহায়তা দিচ্ছে মন্ত্রণালয় ও অভিবাসী শ্রমিক কেন্দ্র (এমডব্লিউসি)।
‘প্রসেস মেইনটেন্যান্স সলিউশনস’-এর ১৫ জন শ্রমিকের মধ্যে পাঁচজন অক্টোবরে তাঁদের বকেয়া বেতন পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন। ২৫ বছর বয়সি বাংলাদেশি শ্রমিক রাজীব হোসেন জানান, আগের সপ্তাহে তিনি বকেয়া বেতন পেয়েছেন। কর্তৃপক্ষ তাঁদের প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতেই নতুন নিয়োগকর্তা খোঁজার অনুমতিপত্র দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
তবে বাংলাদেশে দালালদের দেওয়া অর্থ ফেরত পাওয়া কিংবা নির্মাণ খাতের সার্টিফিকেশন অর্জনের বিষয়ে এমওএম সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারছে না বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে, এমডব্লিউসি জানিয়েছে, অংশীদার সংস্থাগুলোর সহায়তায় তারা প্রায় ৯০ জন শ্রমিককে খাবার দিচ্ছে। পাশাপাশি তাঁদের অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে।
বেতন না দিলে বাজেয়াপ্ত হতে পারে সিকিউরিটি বন্ড
দ্য স্ট্রেইটস টাইমস-এর অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠান দুটির কার্যক্রমে অনিয়ম এবং ভুয়া কর্মী দেখিয়ে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সিঙ্গাপুরের আইন অনুযায়ী, বিদেশি কর্মীদের নির্ধারিত সময়ে বেতন দিতে ব্যর্থ হলে নিয়োগকর্তার জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক সিকিউরিটি বন্ড বাজেয়াপ্ত হতে পারে।
জনশক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তদন্তে শ্রম আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে তদন্ত চলার পাশাপাশি শ্রমিকদের বকেয়া বেতন আদায়, নতুন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং সিঙ্গাপুরে আসার খরচ মেটাতে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের বিষয়গুলো এখনো অনিশ্চিত। কাজ ও আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে থাকা পরিবারের ভরণপোষণ নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

