স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড ব্যবহারে বিধিনিষেধ নিয়ে বিতর্ক, ওয়াশিংটন-কিয়েভের টানাপোড়েনের মধ্যে নতুন উদ্বেগ
ইউক্রেনের কিছু অস্ত্রের গতিসীমা এবং স্পেসএক্সের স্টারলিংক ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের সঙ্গে সেগুলোর সংযোগে আরোপিত বিধিনিষেধের পেছনে মার্কিন সরকারের ভূমিকা থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রযুক্তি ধনকুবের ইলন মাস্ক। তাঁর দাবি, স্টারলিংকের সামরিক সংস্করণ স্টারশিল্ডের মালিক ও নিয়ন্ত্রক মার্কিন সরকার এবং এর গতি ও ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করে মার্কিন সামরিক বাহিনী ও শেষ পর্যন্ত দেশটির প্রেসিডেন্ট।
ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন পরিচালনা, রুশ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা এবং নিজেদের আকাশসীমা রক্ষায় স্টারলিংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে গত মঙ্গলবার রাতে নেটওয়ার্কটিতে নতুন গতিসীমা আরোপের পর দেশটির সামরিক অভিযানে বিঘ্ন ঘটছে বলে অভিযোগ করে কিয়েভ। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এই পদক্ষেপের সঙ্গে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সম্পর্ক থাকতে পারে।
স্টারশিল্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মাস্কের বক্তব্য
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে মাস্ক জানান, স্টারশিল্ডের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ মার্কিন সরকারের হাতে। এই সেবার গতি বা ব্যবহারের ওপর যেকোনো সীমা আরোপের সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং চূড়ান্তভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এর আগে সংযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে মাস্ক এক্সে পোস্ট করেছিলেন। ব্রিটিশ গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এটি কোনো ভুল অথবা বড় ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যা হতে পারে বলে তিনি আশা করছেন। একই সঙ্গে সংযোগ আবার চালু করার অনুরোধ জানান তিনি।
মাস্ক আরও বলেন, স্টারলিংক কেবল বেসামরিক বা প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য ব্যবহার করা উচিত; আক্রমণাত্মক সামরিক উদ্দেশ্যে এর ব্যবহার একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুপযুক্ত। এ বিষয়ে মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার গতিসীমা
স্পেসএক্সের মালিকানাধীন স্টারলিংক গত মঙ্গলবার রাতে গতিসীমা ঘণ্টায় ১০০ মাইল বা প্রায় ১৬০ কিলোমিটার নির্ধারণ করে। এর ফলে ওই গতির চেয়ে দ্রুতগতিতে চলা যেকোনো অস্ত্র নেটওয়ার্কটির সংযোগ হারিয়ে ফেলত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউক্রেনের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইখাইলো ফেডোরভের মতে, বুধবার সন্ধ্যার মধ্যেই সংযোগ আংশিকভাবে সচল করা হয়। তবে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার স্বার্থে স্টারশিল্ডের ওপর আরোপিত গতিসীমা পুরোপুরি তুলে নেওয়া জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এক্সে দেওয়া পোস্টে ফেডোরভ মাস্ককে ধন্যবাদ জানান এবং তাঁর অব্যাহত সমর্থন কামনা করেন। এর প্রায় এক ঘণ্টা পর মাস্ক ওই পোস্টের জবাবে স্টারশিল্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন।
রাজনৈতিক টানাপোড়েন নিয়ে ইউক্রেনের উদ্বেগ
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা সেরহি বেসক্রেসনভ বুধবার সকালে টেলিগ্রামে লেখেন, স্টারলিংকে বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনা কাকতালীয় হতে পারে না এবং এটি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে তিনি মনে করেন।
রুশ জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ইউক্রেনের অব্যাহত হামলা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন। জেলেনস্কি এর আগে জানিয়েছিলেন, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত জ্বালানি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হলে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় সীমিত করার হুমকি দিয়েছিল। তবে গত মঙ্গলবার ট্রাম্প এ অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এদিকে বুধবার গভীর রাতে এক্সে জেলেনস্কির সমালোচনা করে মাস্ক বলেন, রাশিয়া পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ থামাবেন না এবং এখন তাঁর সরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। এর আগে চলতি সপ্তাহে ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে মাস্ক মন্তব্য করেছিলেন, ইউক্রেনের নতুন নেতা পাওয়ার সময় এসেছে।
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে সামরিক আইন কার্যকর থাকায় ইউক্রেনে নির্বাচন স্থগিত রয়েছে।
রুশ হামলায় প্রাণহানি ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়
স্টারলিংকে বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন রাশিয়া ইউক্রেনে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় রাজধানী কিয়েভে বেশ কয়েকজন নিহত হন এবং ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত যোগাযোগ ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জেলেনস্কি হামলাটিকে রাশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনী বেশ কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করলেও কিছু হামলা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। হামলার পর দেশজুড়ে অন্তত ছয় লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ড্রোন হামলার আগে তাঁরা কোনো সতর্কবার্তা পাননি।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার ভোরে ইউক্রেনের ডনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে রুশ হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক গভর্নর ওলেকসান্দর হানঝা।
স্টারলিংক ও স্টারশিল্ডের পার্থক্য
স্পেসএক্সের মালিকানাধীন স্টারলিংক একটি বেসামরিক সেবা, যা নিম্ন ভূ-কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সরবরাহ করে। অন্যদিকে, স্টারশিল্ড বিশেষভাবে সরকার ও সামরিক ব্যবহারের জন্য তৈরি।
যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগের জন্য স্টারলিংকের ওপর ইউক্রেনের নির্ভরতা এবং সামরিক ব্যবহারে বিধিনিষেধের প্রশ্নটি তাই দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
জেলেনস্কির যুক্তরাজ্য সফর
গত বুধবার লন্ডন সফরে ব্রিটিশ সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানের এক প্রশ্নের জবাবে জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া থেকে তিন লাখ টন ডিজেল আমদানির বিষয়ে মার্কিন-রুশ চুক্তির পর তিনি মোটেও ভালো বোধ করেননি। তবে বিষয়টি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত আবেগ বা অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে আরও জটিল বাস্তবতা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এক দিনের সফরে ডাউনিং স্ট্রিটে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম তাঁকে আলিঙ্গন করে স্বাগত জানান। এ সময় জেলেনস্কি ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।
জেলেনস্কির পৌঁছানোর আগে ডাউনিং স্ট্রিট ঘোষণা করে, ইউক্রেনে হালকা বহুমুখী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের গতি বাড়ানো হবে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ইতোমধ্যে রুশ ড্রোন ভূপাতিত করতে ব্যবহৃত হয়েছে। বার্নহ্যাম জেলেনস্কিকে আশ্বস্ত করে বলেন, যুক্তরাজ্য ইউক্রেনের পাশে রয়েছে এবং এ অবস্থানের পরিবর্তন হবে না।

