বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

রুশ ডিজেল চুক্তিকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বললেন মার্কিন সিনেটররা

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ আখ্যা, ইউক্রেনের যুদ্ধের অর্থায়নে মস্কোর রাজস্ব বাড়ার আশঙ্কা

রাশিয়ার সঙ্গে করা ডিজেল সরবরাহ চুক্তি বাতিল করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট দলের ১২ জন সিনেটর। তাঁদের অভিযোগ, এ চুক্তির ফলে ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান যুদ্ধের অর্থায়নে মস্কো আরও রাজস্ব পাবে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দাম কমাতে এ উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে না।

মঙ্গলবার ওয়াশিংটন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথালের নেতৃত্বে লেখা এক চিঠিতে ১২ জন আইনপ্রণেতা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে করা চুক্তি থেকে সরে আসতে ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানান। চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির ছয়জন সিনেটরও রয়েছেন।

চুক্তিটির আওতায় রাশিয়ায় উৎপাদিত ডিজেল বিশ্ববাজারে বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সিনেটরদের মতে, এ সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাস্বার্থের পরিপন্থি এবং ইউক্রেনের জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

‘যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর’

চিঠিতে সিনেটররা বলেন, মস্কোকে বিশ্ববাজারে অবাধে রুশ ডিজেল বিক্রির সুযোগ দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। একই সঙ্গে এটি ইউক্রেনের জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা, যারা রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রাণঘাতী ও অবৈধ যুদ্ধের বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করে চলেছে।

তাঁরা আরও বলেন, এ চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষের জন্য উপহার এবং মিত্রদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। তাই চুক্তিটি বাতিল করা উচিত।

চিঠিতে স্বাক্ষরকারী রিপাবলিকানদের মধ্যে সাবেক সিনেট সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা মিচ ম্যাককনেলও রয়েছেন। এতে ট্রাম্পের নিজ দলের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ সামনে এসেছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এ বিরোধ রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জ্বালানির দাম কমানো নিয়ে সংশয়

যুক্তরাষ্ট্রের ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় তা দ্রুত কমানোর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছেন সিনেটররা। তবে তাঁদের যুক্তি, রাশিয়া থেকে ডিজেল সরবরাহ বাড়ালে জ্বালানির বাজারদরে সামান্য প্রভাব পড়তে পারে, কিন্তু তা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে না।

অন্যদিকে, এ চুক্তির মাধ্যমে রুশ সরকার অতিরিক্ত রাজস্ব অর্জন করবে, যা ইউক্রেনে চলমান হামলার অর্থায়নে কাজে লাগতে পারে। যুদ্ধটি ইতোমধ্যে পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন তাঁরা।

সিনেটররা ট্রাম্পকে রাশিয়ার ডিজেল বিক্রি ও আমদানি-সংক্রান্ত লেনদেনের অনুমতি দিয়ে জারি করা সাময়িক লাইসেন্স বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি গত মাসে কংগ্রেসের অনুমোদিত নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। বিশেষ করে চীনসহ যেসব দেশ রাশিয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সহায়তা করছে, তাদের ওপর চাপ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

চিঠিতে পুতিনকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দিয়ে সিনেটররা এমন একটি সমঝোতার উদ্যোগ নিতে ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানান, যা ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

তিন লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহের ঘোষণা

জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অবিলম্বে তিন লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহে সম্মত হয়েছেন বলে গত শুক্রবার ঘোষণা দেন ট্রাম্প। আগামী নভেম্বরে আরও পাঁচ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে বলেও জানান তিনি।

এরপর মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় রাশিয়ায় উৎপাদিত ডিজেল বিক্রি, আমদানি এবং এ-সংক্রান্ত লেনদেনের অনুমতি দিয়ে একটি সাময়িক লাইসেন্স জারি করে। সিনেটররা ওই লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।

চুক্তির অর্থনৈতিক সুফল নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংশয়

চুক্তিটির অর্থনৈতিক সুফল নিয়ে সিনেটরদের সংশয়ের সঙ্গে মঙ্গলবার একমত পোষণ করেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনীতি বিষয়ক প্রধান ভালদিস ডোমব্রোভস্কিস।

এএফপিকে তিনি বলেন, রাশিয়ার প্রস্তাবিত ডিজেল সরবরাহের সামষ্টিক অর্থনৈতিক দিক থেকে উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব নেই। প্রতিশ্রুত পরিমাণ ডিজেল মস্কো বাস্তবে সরবরাহ করতে পারবে কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা

রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল চুক্তি ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থানকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের হামলার সমালোচনা করে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

শনিবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে সতর্ক করে ট্রাম্প বলেন, তাঁকে ‘যেকোনো মূল্যে’ এসব হামলা বন্ধ করতে হবে।

অন্যদিকে, সিনেটর ব্লুমেনথাল অভিযোগ করেন, শীত ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ইউক্রেনের দুর্ভোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন পুতিন এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থার সুযোগ নিচ্ছেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ব্লুমেনথাল লেখেন, ‘আবারও পুতিন ট্রাম্পকে বোকা বানাচ্ছেন।’

রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য বাড়ানোর এ উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানির দাম কমাতে কতটা কার্যকর হবে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন