বিতর্কিত সীমান্তের ২৮টি কৌশলগত স্থানের নাম সরকারি মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করেছে ভারত, পাল্টা একে অবৈধ ও অকার্যকর বলছে বেইজিং
লাদাখকে ভারতের ‘অবিচ্ছেদ্য ও অখণ্ড অংশ’ হিসেবে উল্লেখ করে নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে নয়াদিল্লি। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটির ২৮টি কৌশলগত স্থান ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের নাম নির্ধারণ করে সরকারি মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগে চীনের আপত্তির পর মঙ্গলবার এ অবস্থান স্পষ্ট করে ভারত সরকার।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, লাদাখের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সরকারি মানচিত্রে এসব স্থানকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করার উদ্দেশ্য হলো সেগুলো নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, চীনের আপত্তি সত্ত্বেও লাদাখ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ—এ প্রতিষ্ঠিত সত্য পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
এর আগে গত ২ অক্টোবর ভারত লাদাখের ২৮টি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের নাম সরকারি মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করে। তালিকায় প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোলের (এলএসি) কাছাকাছি গোগরা ও হট স্প্রিংসের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিরোধপূর্ণ এলাকাও রয়েছে।
মানচিত্রে ২৮টি স্থানের নাম
লাদাখ প্রশাসনের সঙ্গে পরামর্শ করে স্থানগুলোর নাম নির্ধারণের এ উদ্যোগ নিয়েছে ভারত সরকার। এর লক্ষ্য সরকারি মানচিত্র প্রণয়নের কাজ আরও সুশৃঙ্খল করা, ভৌগোলিক স্থানগুলোকে নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা এবং সংবেদনশীল সীমান্ত অঞ্চল সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো।
ভারতের নির্ধারিত নামের তালিকায় রয়েছে আলিশা গিরি, ব্রাংসা, চাপচিঙ্গাল গিরিপথ, কনিষ্ক শৃঙ্গ, করুণ পীর পর্বত, কুকসেল, মার্তণ্ড গিরি, পারপিক হিমবাহ, স্কামরি হিমবাহ, শাচমিরিক গিরিপথ, শ্কোরগা উপত্যকা, জোরাওয়ার শৃঙ্গ, দেহরা কম্পাস ও দ্রাক কার্পো।
এ ছাড়া তালিকায় রয়েছে জোলমোরি, কুমারায়ণ পয়েন্ট, পাংলুং, রিনচেন জাংপো, শাক্যশ্রী গিরি, গুরু রিনপোছে, শামাল লুংপা, ইয়াংপা নদী, মারপা লোৎসাভা রি, মিলারেপা কাংরি, শিব রি ও মহেশ্বর রি।
শামাল লুংপা ১৯৫০-এর দশকে সেনাদের টহল ও অবস্থান নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত একটি পথ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চীনের আপত্তি, ভারতের পাল্টা অবস্থান
ভারতের এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং ভারতের ঘোষিত নামগুলোকে অবৈধ ও অকার্যকর বলে দাবি করেছেন। মঙ্গলবার চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম দ্য গ্লোবাল টাইমস-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরা হয়।
মাও নিংয়ের দাবি, চীন ভারতের একতরফাভাবে প্রতিষ্ঠিত তথাকথিত ‘লাদাখের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল’কে স্বীকৃতি দেয় না। ভারতের নির্ধারিত নামগুলোরও বিরোধিতা করে বেইজিং। চীনের বক্তব্য, ভারত-চীন সীমান্তের পশ্চিমাঞ্চলের সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো চীনের অংশ এবং নাম পরিবর্তন করে এ বাস্তবতা বদলানো যাবে না।
অন্যদিকে, ভারতের দাবি, সরকারি মানচিত্রে ২৮টি স্থানের নাম অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে অঞ্চলটির ভৌগোলিক পরিচিতি ও প্রশাসনিক নথিপত্র আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ উদ্যোগের মাধ্যমে নিজেদের ভূখণ্ডগত অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করেছে নয়াদিল্লি।
গোগরা ও হট স্প্রিংসের কৌশলগত গুরুত্ব
গোগরা ও হট স্প্রিংস পূর্ব লাদাখের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকা। ২০২০ সালে ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার পর স্থান দুটি বিশেষভাবে বিরোধপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিতি পায়। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর ভারতীয় সেনাদের টহল কার্যক্রমের জন্যও এলাকাগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তের বিভিন্ন অংশের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ চলছে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর বিভিন্ন এলাকায় ভূখণ্ডগত দাবি নিয়ে দুই দেশ নিয়মিত পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছে।
২০২০ সালের প্রাণঘাতী সংঘর্ষ
২০২০ সালের জুনে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ১৯৭৫ সালের পর দুই দেশের সেনাদের মধ্যে সেটিই ছিল প্রথম প্রাণঘাতী সংঘর্ষ। ওই ঘটনায় ভারতের অন্তত ২০ জন এবং চীনের চারজন সেনা নিহত হন।
সংঘর্ষের পর সীমান্তে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ অচলাবস্থা তৈরি হয়। উচ্চপর্যায়ের সামরিক পর্যায়ে এক ডজনেরও বেশি দফা বৈঠকের পর দুই দেশ সংঘর্ষস্থলের আশপাশের কিছু এলাকা থেকে সেনা সরিয়ে নিতে শুরু করে।
তবে সীমান্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে লাদাখের ২৮টি কৌশলগত স্থানের নাম সরকারি মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করার ভারতীয় উদ্যোগকে কেন্দ্র করে দুই দেশের ভূখণ্ডগত বিরোধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

